এক সময় ধান, পাট ও অন্য ফসল চাষ করেও ঠিকমতো সংসার চলত না। ফলে আখ চাষে ঝুঁকে পড়েন কৃষক। প্রথমদিকে অল্প জমিতে চাষ করে ভালো লাভ পাওয়ায় জমির পরিমাণ বাড়াতে থাকেন। তাদের উৎসাহিত করতে নানাভাবে প্রণোদনা দিয়েছে জিল বাংলা চিনিকল কর্তৃপক্ষ। এভাবেই বদলে গেছে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পাঁচ হাজার কৃষকের ভাগ্যের চাকা।
আখচাষিদের একজন পোল্যাকান্দি নামাপাড়ার বাসিন্দা ফিরোজ মিয়া বাবু। ১২ বিঘা জমি চাষ করে চলছিল তাঁর সংসার। চাষ করতেন ধান, পাট ও অন্য ফসল। জমি চাষ করে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে খেয়ে-পরে কোনোরকম দিন চললেও বছর শেষে উদ্বৃত্ত বলতে কিছু থাকত না। এ কারণে এক সময় ধান, পাট চাষের ভাবনা থেমে যায় তাঁর। পরিবর্তন আনতে চান চলমান অর্থনৈতিক অবস্থার। এইচএসসি পাস এই যুবক কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসা করবেন, হাতে ছিল না এমন পুঁজি। কিন্তু সংসারে সচ্ছলতা আনার ভাবনা তাড়িত করে তাঁকে। কারণ সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। কুঁড়েঘরে আর নয়, পাকা বাড়ি করতে হবে। সঙ্গে একটি গাড়িও করবেন এমন বাসনা তৈরি হয় তাঁর।
২০১০ সালের দিকে জিল বাংলা চিনিকল থেকে মৌসুমের শুরুতে সার, বীজ ও কীটনাশক ঋণ নিয়ে প্রথম আখ চাষ শুরু করেন ফিরোজ মিয়া বাবু। প্রথম বছর তিন বিঘা জমিতে আখ চাষ করেন। মৌসুম শেষে প্রতিবিঘা জমি থেকে সব খরচ বাদে লাভ করেন ৪০ হাজার টাকা। এই হিসাবে তিন বিঘা জমি থেকে লাভ করেন এক লাখ ২০ হাজার টাকা। যা ধান পাটসহ অন্য ফসল চাষের তিনগুণ লাভ। সেই থেকে আখচাষি হয়ে যান তিনি। অন্য ফসল বাদ দিয়ে ক্রমেই আখ চাষে ঝুঁকে পড়েন। তাতে খেয়ে-পরে বছর শেষে বেশ ভালো লাভ থাকে তাঁর। আখ চাষ করে এখন পাকা বাড়ি ও গাড়ির মালিক হয়েছেন ফিরোজ মিয়া বাবু। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছেন ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সংসারও চলছে স্বাচ্ছন্দ্যে।
অর্থকরী ফসল আখনির্ভর এই শিল্পে বড় মাত্রায় ঝুঁকি নেমে আসে ২০২০-২১ আখ মাড়াই মৌসুমে। ওই মৌসুমে মিলটি বন্ধের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। বাস্তবেও তাই হয়। ওই মৌসুমে সরকার দেশের ছয়টি চিনিকলে আখ মাড়াই স্থগিত করে। তবে স্থগিত মিলের তালিকায় ছিল না জিল বাংলা চিনিকল। তবে আখ মাড়াই স্থগিতের গুজবে সেসময় আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন চাষিরা। ঝুঁকে পড়েন অন্য ফসল চাষে। অবশ্য মিল কর্তৃপক্ষের চেষ্টায় ২০২১-২২ মাড়াই মৌসুমে আখ চাষ বৃদ্ধি পায়। পাঁচ হাজার ৫৩২ একর জমিতে আখ চাষ হয়। মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ায় মিলটি।
আখ চাষ বৃদ্ধিতে বড় প্রভাব ছিল আখের দাম বৃদ্ধির। আখ চাষ বৃদ্ধির জন্য বিগত কয়েকটি মাড়াই মৌসুমে সরকার আখের দাম কয়েক দফা বাড়িয়েছে। ২০২২-২৩ মাড়াই মৌসুমে আখের দাম ছিল ১৮০ টাকা প্রতি মণ। ২০২৩-২৪ মাড়াই মৌসুমে প্রতি মণ আখের দাম ৪০ টাকা বৃদ্ধি করে ২২০ টাকা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। ২০২৪-২৫ মাড়াই মৌসুমে আবারও প্রতি মণ আখে ২০ টাকা মূল্য বৃদ্ধি করে সরকার। সর্বশেষ প্রতি মণ আখের মূল্য দাঁড়ায় ২৪০ টাকা। এভাবে মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আখ চাষে ঝুঁকে পড়েন দেওয়ানগঞ্জের জিল বাংলা চিনিকল এলাকার চাষিরা।
২০২৫-২৬ রোপণ মৌসুমে পাঁচ হাজার ১০ একর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। গত ২৮ নভেম্বর থেকে ৮৮ দিনের রোপণ মৌসুম শুরু হয়েছে। এই মিলের আওতায় পাঁচ হাজার ৪৪ চাষি রয়েছেন। চলতি রোপণ মৌসুমে উচ্চ ফলনশীল আখের বীজ সরবরাহ করা হবে। এই অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া আখ চাষের অনুকূল। ক্রমেই আখ চাষ ও জিল বাংলা চিনিকলে চিনি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আখচাষিরা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করছেন, এমন দাবি করেছেন জিল বাংলা চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ তরিকুল আলম।























