ঢাকা   বুধবার
২৮ জানুয়ারি ২০২৬
১৪ মাঘ ১৪৩২, ০৮ শা'বান ১৪৪৭

মৎস্যকথন

হারিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের কাইন মাগুর

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ

প্রকাশিত: ০৯:০৯, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬

হারিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের কাইন মাগুর

বিভিন্ন একাডেমিক আলোচনা ও পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে কাইন মাগুর নামের মাছটির সঙ্গে পরিচয়। ২০১৬ সালে পটুয়াখালীতে সরকারি সফরে যাই। সেখানে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কলাপাড়া উপকেন্দ্রের গবেষণা পুকুরে প্রথম কাইন মাগুরের দেখা পাই। প্রতিটির ওজন ছিল দুই থেকে তিন কেজি।

দেখতে অনেকটা আমাদের মিঠা পানির মাগুরের মতো। তখন উপকেন্দ্রে কাইন মাগুর নিয়ে গবেষণা চলছে।
সংশ্লিষ্ট গবেষক জানালেন, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে হ্যাচারিতে কাইন মাগুরের পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যে মাছকে পুকুরে দেশীয় খাবারে অভ্যস্ত করা ও লালন-পালন চলছে। পরে জেনেছি, পর্যাপ্ত ব্রুড মাছের অভাবে গবেষণাটি বেশিদূর এগোতে পারেনি।

খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও বরগুনা জেলার মানুষের কাছে কাইন মাগুর খুবই পরিচিত। অথচ মিঠা পানি অঞ্চলের অনেকে এই মাছ চেনেই না।

Siluriformes বর্গ এবং Plotosidae পরিবারের অন্তর্গত কাইন মাগুরের বৈজ্ঞানিক নাম Plotosus canius (Hamilton, ১৮২২) এবং ইংরেজি নাম Grey Eel Catfish। বাংলাদেশে কাইন মাগুরকে কোনো কোনো এলাকায় গাং মাগুর বা কাওন মাছ নামে ডাকা হয়।

কাইন মাগুর ছাড়াও বিশ্বে চষড়ঃড়ংঁং গণের আরো আটটি প্রজাতি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে হচ্ছে Plotosus japonicus, P. abbreviatus, P. fisadoha, P. limbatus, P. lineatus, P. nhatrangensis, P. nkunga I P. papuensis। একমাত্র P. fisadoha ছাড়া অন্য সব প্রজাতির পাখনায় বিষাক্ত কাঁটা রয়েছে। P. lineatus মাছের কাঁটা সবচেয়ে বিষাক্ত এবং কখনো কখনো এদের কাঁটার বিষক্রিয়ায় মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ভারত মহাসাগর, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং পাপুয়া নিউ গিনি Eel Catfish-এর আদি নিবাস।এরা প্রধানত নোনা পানি এবং মোহনা অঞ্চলে বসবাস করে।

বাংলাদেশে Eel Catfish-এর মাত্র একটি প্রজাতি (কাইন মাগুর) রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া কাইন মাগুর থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ভারত, লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ এলাকায় কাইন মাগুর বেশি ধরা পড়ে। তবে মোহনাসংলগ্ন মিঠা পানির নদ-নদীতেও কাইন মাগুরের দেখা মেলে। এরা দল বেঁধে চলাফেরা করে।

কাইন মাগুর Plotosus গণের অন্যান্য প্রজাতির মধ্যে লম্বায় সবচেয়ে বড়। এরা গড়ে ৮০ সেন্টিমিটার এবং সর্বোচ্চ ১৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। ওজনে ছয় কেজি পর্যন্ত রেকর্ড আছে। এদের দেহ লম্বাটে ও উপনলাকার, মাথা চাপা ও পুরু ত্বক দ্বারা আবৃত, চোখ ছোট এবং মুখে চার জোড়া স্পর্শী আছে।

কাইন মাগুরের পৃষ্ঠীয় পাখনা দুটি; দ্বিতীয় পৃষ্ঠীয় পাখনা ও পুচ্ছ পাখনা একত্রিত হয়ে পায়ু পাখনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এদের ত্বক কালচে বাদামি রঙের। পুরুষ মাছ লম্বায় ৪৪ হতে ৪৮ সেন্টিমিটার এবং স্ত্রী মাছ ৪০ থেকে ৪৪ সেন্টিমিটার হলেই প্রজননক্ষম হয়। স্ত্রী মাছ পুরুষের চেয়ে আগে প্রজননক্ষম হয়। এদের ডিমের আকার অন্যান্য মাছের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড়। এদের প্রজননকাল দীর্ঘ এবং উপকূলীয় জলাশয়ে এরা প্রজনন করে থাকে। প্রজননের সময় কাইন মাগুরের প্যারেন্টাল কেয়ার দেখা যায়। পুরুষ কাইন বাসা তৈরি করে এবং বাচ্চা পাহারা দেয়।

কাইন মাগুর জলাশয়ের তলদেশে বাস করে এবং ছোট ছোট মাছ, ক্রাস্টাসিয়ান্স ও মোলাস্ক এদের প্রধান খাবার। এদের পৃষ্ঠীয় পাখনা ও বক্ষ পাখনায় বিষাক্ত কাঁটা আছে। আত্মরক্ষার্থে এসব বিষাক্ত কাঁটা কাইন মাগুর ব্যবহার করে। কাইন মাগুরের বিষ রক্তকণিকাকে ভেঙে ফেলে।

আইইউসিএন (২০১৫)-এর তথ্য মতে, অতি আহরণ, জলাশয় দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে মা-মাছ নিধনের কারণে এই মাছটি প্রকৃতি থেকে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে এবং এটি লাল তালিকাভুক্ত।

কাইন মাগুর আকারে বড় বিধায় উপকূলীয় জলাশয়ে চাষাবাদের ক্ষেত্রে এটি একটি সম্ভাবনাময় প্রজাতি। বহির্বিশ্বে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এর পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি এরই মধ্যে উদ্ভাবন করা হয়েছে। আমাদের দেশেও মাছটি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা শুরু করা প্রয়োজন।

পোনা উৎপাদন করা সম্ভব হলে মাছটি সহজেই চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে সামগ্রিকভাবে দেশে মাছের উৎপাদন বাড়বে। অনেক দেশে কাইন মাগুর মানবখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এদের দেহে মাংসল অংশের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি, কাঁটা খুব কম এবং খেতে অসাধারণ। কাইন মাগুরে বিষাক্ত কাঁটা থাকলেও মাছটি খেতে কোনো বিধি-নিষেধ কিংবা ভয় নেই।