রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পকে সহায়তার নামে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা ও কাপড় প্রকাশ্যে খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে একদিকে দেশীয় স্পিনিং ও উইভিং মিলগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই গুরুতর অনিয়ম চললেও রহস্যজনক কারণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, গার্মেন্টসের একটি প্রভাবশালী চক্র বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা ও কাপড় আমদানি করে তা কালোবাজারে ছেড়ে দিচ্ছে।
এই চক্রের সঙ্গে কাস্টমস ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। অন্যের বন্ড লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে চলছে এই অবৈধ ব্যবসা। ফলে শুধু শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, রাষ্ট্রীয় কোষাগারও শূন্য হয়ে পড়ছেদেশের আনাচে-কানাচে বন্ড সুতার বাজার।
নারায়ণগঞ্জের টানবাজার ও আড়াইহাজার, নরসিংদীর মাধবদী ও বাবুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জের বেলকুচিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে বন্ড সুবিধার সুতা বিক্রির স্থায়ী বাজার।
এমনকি রাজধানীর ইসলামপুরেও গড়ে উঠেছে চোরাই কাপড়ের বিশাল হাট। দিনের পর দিন প্রশাসনের চোখের সামনে এসব কার্যক্রম চললেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
বন্ড কমিশনারেট মাঝেমধ্যে লোক দেখানো দু-একটি অভিযান (প্রিভেন্টিভ) পরিচালনা করলেও অভিযোগ রয়েছে—পর্দার আড়ালে চোরাকারবারিদেরই লালনপালন করা হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পে।
স্থানীয় মিলগুলোর উৎপাদিত সুতা ও কাপড় বিক্রি না হওয়ায় গুদামে জমছে অবিক্রিত পণ্যের পাহাড়। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৫০টিরও বেশি স্পিনিং মিল।
বিটিএমএর তথ্য ও শিল্পের বাস্তবতা
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে স্পিনিং, উইভিং ও ডাইং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিল মিলিয়ে প্রাইমারি টেক্সটাইল সেক্টরে মিলের সংখ্যা ১ হাজার ৮৬৯টি। এই খাতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জিডিপিতে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের অবদান ২০ শতাংশের বেশি।
বর্তমানে বিটিএমএর সদস্য মিলগুলো নিট পোশাক শিল্পের প্রায় শতভাগ এবং ওভেন পোশাক শিল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ সুতার চাহিদা পূরণ করছে। কিন্তু বন্ড সুবিধার অপব্যবহার অব্যাহত থাকায় এই সক্ষমতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
মিথ্যা ঘোষণা, অসম প্রতিযোগিতা
স্থানীয় মিল মালিকদের অভিযোগ, বন্ড সুবিধায় বানের পানির মতো সুতা আমদানি হচ্ছে। এলসিতে নিম্ন কাউন্টের সুতা দেখিয়ে বাস্তবে উচ্চ কাউন্টের সুতা আনা হচ্ছে। এমনকি অস্তিত্বহীন মিলের নামেও কাপড় আমদানি করে তা খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে দেশীয় শিল্প পড়ছে ভয়াবহ অসম প্রতিযোগিতার মুখে।
সমাধানের প্রস্তাব
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, অবিলম্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তত্ত্বাবধানে বন্ড কমিশনারেটের সদস্যদের নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।
এই কমিটির মাধ্যমে বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউসগুলোতে আকস্মিক পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আমদানির সময় কাস্টমস হাউসগুলোতে এলসিতে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্যের মান যাচাইয়ে অটোমেটেড মেশিন স্থাপন জরুরি।
বিটিএমএ সভাপতির হুঁশিয়ারি
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “বস্ত্রখাত ভয়াবহ দুঃসময় পার করছে। গত এক বছর ধরে সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়েও কোনো সাড়া পাইনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে এনবিআর আদেশ দিচ্ছে না।”
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন মিল বন্ধ হচ্ছে। লোকসান দিয়ে কারখানা চালানো সম্ভব নয়। সরকার যদি সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ না নেয়, তাহলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মিল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তুলা আমদানিতে শুল্ক আছে, অথচ ফিনিশড সুতা শুল্কমুক্ত। করপোরেট কর, ভ্যাট ও টার্নওভার করের বোঝা মিল মালিকদের কাঁধ ভেঙে দিচ্ছে।’
শিল্প ধ্বংসের আশঙ্কা
বাদশা মিয়া টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাদশা মিয়া বলেন, ‘৪৬ বছর ধরে বন্ড সুবিধা চলছে। এই সুবিধা রেখে কখনোই ব্যাকওয়ার্ড শিল্প দাঁড়াতে পারে না। ভারত কম দামে সুতা ডাম্পিং করছে। দেশীয় মিল বন্ধ হয়ে গেলে ভারত একচেটিয়া দাম বাড়াবে—করোনার সময় যেমন করেছে।’
বিটিএমএর সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার বলেন, ‘প্রথমে টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হবে। এরপর ভারত সুতা সরবরাহ বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের পোশাক খাত অকেজো হয়ে পড়বে। স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়াতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ শুল্ক সুবিধা তুলে নিলে পুরো খাত বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ট্যারিফ কমিশনের ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বন্ডের বাইরে রাখার সুপারিশ বাস্তবসম্মত। কিন্তু লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে তা আটকে আছে। সরকার আসলেই শিল্প চায় কি না—সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠেছে।’























