ঢাকা   বুধবার
০৪ নভেম্বর ২০২৬
১৯ কার্তিক ১৪৩৩, ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

২৫ কোটি টাকার ভিএইচটি, তবুও বাড়ছে না আমের রপ্তানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:০৯, ১২ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০০:৪৪, ১২ আগস্ট ২০২৬

২৫ কোটি টাকার ভিএইচটি, তবুও বাড়ছে না আমের রপ্তানি

কৃষি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে ঢাকঢোল পিটিয়ে মাসখানেক আগে ঢাকার গাবতলীতে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে উদ্বোধন করা হয় দেশের একমাত্র ‘ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’। উদ্বোধনের সময় কৃষিমন্ত্রীর ঘোষণা ছিল—এর মাধ্যমে আম ও কৃষি পণ্য রপ্তানিতে বিপ্লব আসবে। কারণ, দৈনিক ১২ টন আম ও অন্যান্য ফলমূলের ক্ষতিকর পোকা, ডিম ও লার্ভা মুক্ত করার সক্ষমতা রয়েছে এই প্লান্টের। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; ভরা আম মৌসুমেও কোটি টাকার এই প্লান্ট সচল থাকছে সপ্তাহে মাত্র এক বা দুইদিন।

প্ল্যান্টটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন:

"খুব কম সময়ের মধ্যে আমাদের আমের রপ্তানি—আজকে যা রপ্তানি হচ্ছে তার থেকে কত গুণ বৃদ্ধি পাবে তা কল্পনাও করতে পারবেন না।"

রাজশাহীর মিষ্টি আম জাপান, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় কোয়ারেন্টাইন নিরাপত্তা শর্তাবলী। দেশে বছরে প্রায় ২৭ লাখ টন আম উৎপাদিত হলেও কোয়ারেন্টাইন শর্ত ও জীবাণুমুক্তকরণের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অভাবে রপ্তানি হয় মাত্র ৩,১০০ টন। এই জটিলতা কাটাতেই ঢাকার গাবতলীতে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্রযুক্তি বসানো হয়।

তবে উদ্বোধনের ১ মাসের মাথায় দেখা গেছে, আম কুড়ানোর প্রধান মৌসুমেও এই বিশাল প্লান্টটি নিথর পড়ে রয়েছে। কনভেয়ার বেল্ট ও বাষ্প তৈরির চেম্বারগুলো বেশিরভাগ দিনই বন্ধ থাকে।

এই পরিস্থিতির পেছনে স্থান নির্বাচনের ভুল বা পরিকল্পনাকে দায়ী করছেন মাঠপর্যায়ের চাষী ও রপ্তানিকারকরা। তাদের ভাষ্যমতে, প্রধান আম উৎপাদন অঞ্চল থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে প্লান্ট স্থাপন করায় এটি কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

রপ্তানিকারক ও চাষী ইসমাইল হোসেন খান শামীম জানান:

"একদিকে এয়ারপোর্ট, অন্যদিকে কোয়ারেন্টাইন ও ভিএইচটি (VHT) প্লান্ট—বিষয়টি অত্যন্ত মুশকিলের। ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্টের জন্য আমটা লাগে একদম সতেজ, যাতে গাছ থেকে হারভেস্ট (তোলার) করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমরা ট্রিটমেন্ট করতে পারি। অথচ আম যেখানে বেশি উৎপাদন হয় (অরচার্ড এরিয়া), সেখানে না করে গাবতলীতে প্লান্ট করা হয়েছে। আমার মনে হয়, এর সুফল আমরা ভোগ করতে পারব না এবং এতে জনগণের টাকার অপচয় হলো।"

মাঠের মানুষের এই আক্ষেপের সাথে একমত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। রপ্তানিযোগ্য আম বিশেষজ্ঞ আরিফুর রহমান মনে করেন, আম আমদানিকারক দেশ ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে ভৌগোলিক দূরত্বের ওপর এমন একটি প্লান্ট গড়ে তোলা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না।

তার মতে:

"কোয়ারেন্টাইন সংক্রান্ত চিন্তা আর কনজিউমারের (ভোক্তা) ডিমান্ডের চিন্তা আলাদা। কনজিউমারের চাহিদাকে যখন প্রাধান্য দেবেন, তখন বাগানের কাছাকাছি কোনো কেন্দ্রীয় (এগ্রিগেট) জায়গায় এটি করা উচিত ছিল, যাতে অনেকগুলো অরচারের মালিকরা সহজে সুবিধা নিতে পারেন।"

আমের মূল বাগান অঞ্চলসমূহ থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে প্লান্ট বসানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে সিদ্ধান্তগত এই কাঠামোগত ভুলের সত্যতা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালকও।

প্রকল্প পরিচালক রুহুল আমিন তার বক্তব্যে জানান:

"যখন একটি প্লান্ট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তখন দেশের সার্বিক বিবেচনা থেকে করা হয়েছে—যাতে রাজশাহী, সাতক্ষীরা, রংপুর বা পাহাড়ি অঞ্চলের সবাই সুবিধা পান। হয়তো ওই সার্বিক আঙ্গিক থেকেই প্রথমে এটি ঢাকায় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।"

প্রযুক্তির সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সঠিক স্থান নির্বাচন ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাবেই গাবতলীর প্রায় ২৫ কোটি টাকার এই ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি এখন অকার্যকর হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ