ঢাকা: সারাদেশে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে রোপণ করা সরকারি খাটো জাতের ‘ভিয়েতনামি নারিকেল গাছ’ এখন কৃষকদের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) এক সর্বশেষ গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৩ শতাংশ ভিয়েতনামি নারিকেল গাছে ফলন এসেছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির জন্য ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত এই গাছগুলো কেটে ফেলার অনুমতি চেয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছে বিএডিসি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এক সময় এই খাটো জাতের নারিকেল গাছের ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। সেই প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের হাজার হাজার কৃষক কপালে হাত দিয়ে বসেন। বর্তমানে সারাদেশে এ ধরনের ১০ লাখেরও বেশি গাছ লাগানো হয়েছে।
খোদ বিএডিসির নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৪২টি সরকারি খামারে রোপণ করা ৫ হাজারেরও বেশি ভিয়েতনামী নারিকেল গাছের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ গাছে ফুল এসেছে। আর শেষ পর্যন্ত ফল টিকেছে মোটে ১৪৪টি গাছে—যা মোট গাছের মাত্র ৩ শতাংশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্দেশনা মেনে নিবিড় পরিচর্যা করার পরও ফলন না আসায় বিপাকে পড়েছেন সরকারি কর্মকর্তারাও।
সংস্থাটির গাজীপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপসহকারি পরিচারক শাহ আলম জানান, এই গাছগুলো তো ডাব দিচ্ছে না, উলে্টা রোগবালাই নিয়ে এসেছে। যা দেশী নারিকেল গাছগুলোকে আক্রান্ত করছে। দেশের ৪২ টি খামারে ৪৫ একর জায়গা দখল করে আছে ভিয়েতনামী নারিকেল গাছ। যা দ্রুত অপসারণ করে সেখানে অন্যান্য ফলদ গাছ লাগানো জরুরি বলে দাবি তার।
বিএডিসি এই গাছগুলো অপসারণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি চিঠি দিয়েছে। যা এগ্রি টোয়েন্টিফোর ডটটিভির হাতে এসেছে।
ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, অনেক বিনিয়োগ এবং দিনরাত পরিচর্যা করার পরও দুই-একটি গাছে ডাব আসলেও তা পারফেক্ট বা পরিপক্ব হচ্ছে না। উল্টো এই বিদেশী জাতের গাছ দেশে নতুন নতুন রোগবালাই নিয়ে এসেছে। এর ফলে স্থানীয় দেশী জাতের নারিকেল গাছগুলোও মারাত্মক মাকড় ও পোকার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। ক্ষোভ ও লোকসানের মুখে নাটোরের সেলিম রেজাসহ অনেক কৃষক ইতিমধ্যেই তাদের খামারের শত শত ভিয়েতনামী নারিকেল গাছ কেটে ফেলেছেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনসি্টটিউট এর সাবেক মহাপরিচালক ড. নাজিুরল ইসলাম বলছেন, পরিবেশগত উপযোগিতা যাচাই না করে এবং কোনো প্রকার বাণিজ্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এই বিদেশী জাত দেশে আনা মোটেও ঠিক হয়নি। এটি পরিবেশ এবং ভূগর্ভস্থ পানির জন্য এক নীরব ঘাতক।
তবে প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মেহেদী মাসুদের দাবি, সঠিক পানি সরবরাহ এবং অব্যবস্থাপনার কারণেই মূলত এই জাতটি ফলন দিচ্ছে না।
পরিবেশগত ঝুঁকি এবং কৃষকদের ক্রমাগত লোকসানের কথা বিবেচনা করে বিএডিসি এখন এই গাছগুলো পুরোপুরি অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কার স্বার্থে এবং কার চরম উদাসীনতায় কোনো রকম উপযোগিতা যাচাই না করে এই ক্ষতিকর জাত কৃষকদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হলো—তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।























