রাজধানীর জাতীয় চিড়িয়াখানায় ফের নতুন প্রাণের আনন্দ। বাঘ দম্পতি টগর-বেলীর ঘরে জন্ম নিয়েছে তুলতুলে চারটি শাবক। গত ৪ জানুয়ারি চিড়িয়াখানার সেড ‘সি’-১১-এ শাবকগুলোর জন্ম হয়। এই জন্ম দেশে বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণ কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
১০ দিন বয়সী শাবক চারটি এরই মধ্যে চিড়িয়াখানার প্রাণিবিদদের চোখের মণি হয়ে উঠেছে। এই চারটি শাবক মিলিয়ে বর্তমানে চিড়িয়াখানায় মোট বাঘের সংখ্যা দাঁড়াল ১৬টিতে। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ছয়টি পুরুষ ও ছয়টি স্ত্রী বাঘ রয়েছে। নতুন চারটি শাবকের লিঙ্গ নির্ধারণ করা যাবে ছয় মাস বয়স হলে।
এরপর তাঁদের নাম রাখা হবে বলে জানিয়েছেন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।
জন্মের মুহূর্ত থেকে বিশেষ যত্ন : মা বাঘিনী বেলী সুস্থ আছে। আর নিয়ম অনুযায়ী শাবক চারটি জন্মের পর বাবা টগরকে অন্যত্র রাখা হয়েছে। ১০ দিন বয়সী শাবকগুলোর চোখ এখনো পুরোপুরি না খুললেও তারা স্বাভাবিকভাবে দুধ পান করছে।
প্রাণী চিকিৎসকরা দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন, যাতে মায়ের স্বাভাবিক আচরণে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। একই সঙ্গে মশা-মাছি থেকে রক্ষায় শাবক চারটিকে ইলেকট্রিক জালের বেষ্টনিতে রাখা হয়েছে। মশা-মাছি বাঘ শাবকের বড় শত্রু।
চিড়িয়াখানা সূত্র বলছে, জন্মের পর প্রথম আট মাসে বাঘ শাবকের মারা যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। ফলে এই সময় অতিক্রম না হওয়া পর্যন্ত বাঘ শাবকগুলোকে প্রদর্শন করা হবে না।
আর ঠাণ্ডা থেকে রক্ষায় শাবক চারটিকে রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থায়। খাঁচায় বৈদ্যুতিক হিটার এবং মেঝেতে খড় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভাইরাস-জীবাণু থেকে রক্ষায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
বড় হচ্ছে বাঘ পরিবার : দেশে বন্য বাঘের সংখ্যা কমলেও চিড়িয়াখানায় পরিকল্পিতভাবে প্রজনন কার্যক্রম চলছে। বর্তমানে জাতীয় চিড়িয়াখানায় মোট ১২টি প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ রয়েছে। নতুন জন্ম নেওয়া চারটি শাবক এ সংখ্যাকে আরো বাড়িয়েছে। শাবক চারটি ভবিষ্যতে সংরক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চিড়িয়াখানার প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার মোহাম্মদ মজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতেই আমরা পরিবেশ উন্নত করেছি। তারই ফল এই চারটি সুস্থ-সবল শাবক। তবে আমরা ধারণক্ষমতার কথা বিবেচনা করে অনেক সময় নতুন প্রজনন যাতে না হয় সে ব্যবস্থাও নিই।’
নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণে কড়া নজরদারি : জন্মের পর থেকে শাবকগুলোকে ‘নো-ডিস্টার্ব জোনে’ রাখা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সেখানে অতিরিক্ত আলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ রয়েছে। জনসাধারণের প্রবেশও সম্পূর্ণ বন্ধ। সার্বক্ষণিক ক্যামেরা নজরদারি রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে মা বাঘিনীর মানসিক চাপ কমাতে শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, ঠিকমতো এখনো চোখ ফোটেনি শাবকগুলোর। তার পরও মায়ের আদর-যত্নেই রয়েছে তারা। মা বাঘিনীর শরীরে শরীর লাগিয়ে খুনসুটি করছে। ঘুমের সময় ছোট্ট নখ দিয়ে মাকে স্পর্শ করা, কখনো আবার মায়ের লেজ ধরে টানাটানি করার চেষ্টা করছে। এভাবেই এখন শাবকগুলোর সময় কাটছে। জন্মের পর থেকে নিয়মিত ওজন বাড়ছে, গায়ের কমলা রঙে ধীরে ধীরে কালো ডোরা স্পষ্ট হচ্ছে।
টগর-বেলী দম্পত্তির ১১ সন্তান : নতুন চার শাবকসহ টগর-বেলী দম্পতি গত পাঁচ বছরে ১১টি সন্তান জন্ম দিয়েছে। এবার সর্বোচ্চ চারটি, এর আগে ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল দুটি, ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল তিনটি এবং ২০২১ সালের ২৫ মে দুটি শাবকের জন্ম দেয়।
কবে দেখা মিলবে চার শাবকের অপেক্ষায় দর্শনার্থীরা : চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শাবকগুলোর বয়স অন্তত আট মাস পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ দর্শনার্থীদের সামনে আনা হবে না। এর আগে তারা পর্যাপ্ত শক্তি অর্জন করবে। হাঁটাচলায় স্বাভাবিক হবে এবং প্রয়োজনীয় টিকা সম্পন্ন করা হবে। তারপর পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে তাদের নাম ঠিক করে দর্শনার্থীদের সামনে আনা হবে।’























