ঢাকা   রোববার
১৯ এপ্রিল ২০২৬
৫ বৈশাখ ১৪৩৩, ০১ জ্বিলকদ ১৪৪৭

গোখাদ্যের দাম বাড়ায়, বড় গরু নিয়ে শঙ্কিত খামারি

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৯:৩০, ১৮ মে ২০২৫

গোখাদ্যের দাম বাড়ায়, বড় গরু নিয়ে শঙ্কিত খামারি

এগিয়ে আসছে ঈদুল আজহা। এই ঈদে কোরবানির জন্য প্রতি বছর যত্ন নিয়ে পশু লালনপালন করেন দেশের খামারি ও কৃষকরা। মেহেরপুর ও সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার খামারিরা এবার শঙ্কিত বিপুল খরচে পালন করা বড় আকারের গরু নিয়ে। গোখাদ্যের দাম বাড়ার কারণেও তারা আকাঙ্ক্ষিত মুনাফা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মড়কা গ্রামের খামারি সাজাহান আলী প্রতি বছর কোরবানির জন্য গরু পালন করেন ৩০টি। এ বছরও খামারে ৫-১০ লাখ টাকা দামের গরু আছে। আগের বছর ২৩টি গরু তিনি বিক্রি করেন ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকায়। সাজাহানের দাবি, সেবার মাত্র ২ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল। আগের বছরের সাতটির সঙ্গে আরও ২৩টি গরু কিনে এবার পালন করেন।

এই খামারির ভাষ্য, গত বছর ঈদুল আজহার এক মাস আগে থেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন সিলেট-চট্টগ্রামের ব্যাপারীরা। ঈদের ২২ দিন আগেই তাঁর খামার থেকে ব্যাপারীরা কিনে নেন ৯টি গরু। আরও ১০টি গরু বিক্রি করে ফেলেন ঈদের ১৭ দিন আগেই। বাকি চারটি তুলনামূলক ছোট গরু মেহেরপুরের হাটে বিক্রি করেন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তাঁর বড় ৩০টি গরুর কোনোটিই বিক্রি হয়নি। 

জেলায় এবার কোরবানির জন্য ৩৫০টি বাণিজ্যিক খামারসহ ২৮ হাজার পারিবারিক খামারে প্রস্তুত করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৫২৫টি পশু। এর মধ্যে গরু ৫৪ হাজার, ছাগল ১ লাখ ১৬ হাজার ও ভেড়া ২ হাজার। জেলায় এবার কোরবানির পশুর চাহিদা ৯০ হাজারের মতো। বাকি প্রায় ৮২ হাজার পশু অন্য জেলায় বিক্রির আশা করছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা।

গোখাদ্যের দাম বাড়ায় বিমুখ খামারি
২০২৪ সালে জেলার ৩৭৯টি বাণিজ্যিক খামারসহ ২৮ হাজার ৭০০ পারিবারিক খামারে তৈরি করা হয়েছিল ৫৯ হাজার ৫০০ গরু, ১ লাখ ২৮ হাজার ছাগল-ভেড়া। জেলার চাহিদা মিটিয়ে ৯৮ হাজার পশু অন্য জেলার হাটে উঠানো হয়। সেই হিসাবে এ বছর বড় খামার কমেছে ২৯টি। প্রায় ৭০০ পরিবার গরু-ছাগল পালন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

পশু পালনের খরচ বাড়ার কারণেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন খামারি সাজাহান আলী। তিনি বলেন, গত বছর খইলের কেজি ছিল ৪২ টাকা, এবার কিনতে হচ্ছে ৪৬ টাকায়। ৩০০ টাকা পুনের (৮০ আঁটিতে এক পুন) বিচালি বা খড় এবার কিনেছেন ৪০০-৫০০ টাকায়। ৩৪ টাকার ভুট্টা ভাঙার দর বেড়ে ৪০-৪২ টাকায়, ১৫-১৬ টাকার ধানের গুঁড়া ২০-২১ টাকায়, ৪০ টাকা আঁটির কাঁচা ঘাস তাদের কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকায়।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া সদর ইউনিয়নের খালিয়াপাড়া গ্রামের খামারি আব্দুল খালেকের কথায়ও গোখাদ্যের দাম বাড়ার তথ্য পাওয়া যায়। এবার তিনি খামারে মোটাতাজা করেছেন ৩৫টি গরু। খালেক বলেন, প্রায় ছয় মাস আগে গরু প্রস্তুতের কাজ শুরু করেন। এবার অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। গত বছর ভুসি ছিল ৫০-৫২ টাকা কেজি, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৫৩-৫৫ টাকা। খইলের কেজি ছিল ৩৮-৪০ টাকা, এবার ৪২-৪৫ টাকা। ৫০ কেজি বস্তার ধানের গুঁড়ার দাম ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৯০০ টাকা। ১ হাজার টাকার ছোলার বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। 

খালেকের খামারে গত বছর বড় গরু ছিল পাঁচটি। ঈদের বেশ কিছুদিন আগেই চারটি বিক্রি করেন খামার থেকেই। একটি ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করেন। এবার চারটি বড় গরুর কোনো ক্রেতাই বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আসেননি। এগুলো বিক্রি নিয়ে শঙ্কিত তিনি। 

উল্লাপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শেখ এম এ মতিনের দেওয়া তথ্যমতে, এ বছর উল্লাপাড়ায় কোরবানির জন্য ৭৭ হাজার পশু প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে গরু ২৯ হাজার, ছাগল ৪২ হাজার ও ভেড়া ৬ হাজার। উপজেলায় ৪২ হাজার কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে। গত বছর এখানে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল ৬৮ হাজার গরু-ছাগল। চাহিদা ছিল ৩৭ হাজার। 

উপজেলার বড়হর ইউনিয়নের বড়হর গ্রামের বৃহত্তম খামারটি মোমিনুল হক লিটনের। এবার তাঁর এখানে কোরবানিযোগ্য ষাঁড় আছে ১০০টি। আকারভেদে এগুলোর দাম দেড় লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। এগুলোর মধ্যে শাহীওয়াল জাতের ৩০টি ও ফ্রিজিয়ান জাতের ২০টি। বাকি ষাঁড়গুলো দেশি জাতের। তিনি দাবি জানান, কোনোভাবেই যেন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় গরু হাটে না আনা হয়। তাহলে তাদের গরুর দাম কমে যাবে।  

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শেখ এম এ মতিন মনে করেন, এ বছর অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত কঠোর হওয়ায় ভারতীয় গরু আনার সুযোগ হবে না। তাই খামারিদের আতঙ্কের কারণ নেই।

আলোচনায় ছাগলকাণ্ড
মেহেরপুর সদরের হরিরামপুর গ্রামের ইলিয়াস আলীর খামারে বড় গরু আছে ২৩টি। এগুলোর দাম ৭ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে। এসব গরুর বেশির ভাগ ক্রেতাই সিলেট অঞ্চলের প্রবাসী পরিবার ও চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, ‘অনান্য বছর সিলেট-চট্টগ্রামের ব্যাপারীরা বড় বড় গরু কিনে নিয়ে যেত। কিন্তু এ বছর বড় গরুর কোনো চাহিদা নেই। গত কোরবানির ঈদের আগে ছাগলকাণ্ডের পর দামি গরুর ক্রেতা হারিয়ে গেছে। ফলে আমি বড় গরুগুলো বিক্রি নিয়ে খুবই শঙ্কার মধ্যে দিন পার করছি।’

একই উপজেলার শালিকা গ্রামের খামারি রিপন হোসেন বলেন, ‘আমার খামারে এবার খুব বড় গরু নেই। কারণ গেল বছর বড় গরু বিক্রি করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছিলাম। এসব পালনে খরচও অনেক বেড়েছে। তাই এবার কোরবানিযোগ্য ছোট ছোট ৩৫টি গরু পালন করেছি। এগুলো দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি করতে চাই।’

এক বছর ধরে ১০টি ছাগল পালন করছেন উল্লাপাড়ার পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের বেতবাড়ী গ্রামের আব্দুল করিম। আগেও হাটে বিক্রি করে লাভ করেছেন। দুই সপ্তাহের মধ্যেই সব ছাগল বিক্রির বিষয়ে আশাবাদী তিনি। 

কিছু খামারির বিরুদ্ধে স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগ করে গরু মোটাতাজা করার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে গাংনীর ভেটেরিনারি চিকিৎসক শফিউদ্দিনের ভাষ্য, এ ধরনের গরু দেখলেই চেনা যায়। মেহেরপুরে এমন গরু পালনের তেমন তথ্য নেই। হরমোন দেওয়া গরু তিন-চার দিনের মধ্যে বিক্রি করে দিতে হবে। না হলে অসুস্থ হবে, মারা যেতেও পারে।

মেহেরপুর জেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজমুল হাসান শাওন বলেন, মোটা গরু মানেই হরমোন বা স্টেরয়েড দেওয়া হয়েছে, এ ধারণা ঠিক নয়। একটু চেষ্টা করলেই এসব গরু চেনা যায়। হাটে এমন গরুর বিক্রি ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের একাধিক দল থাকবে। সূত্র: সমকাল

এগ্রি২৪.টিভির বিদেশ, জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হতে আগ্রহীরা সিভি  ও নিউজ পাঠান agri24.tv@gmail.com এই ইমেইলে