ঢাকা   শনিবার
০২ মে ২০২৬
১৮ বৈশাখ ১৪৩৩, ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪৭

৬ দাবিতে আন্দোলন

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: হল ছাড়ার নির্দেশ প্রত্যাখ্যান

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১০:০৩, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: হল ছাড়ার নির্দেশ প্রত্যাখ্যান

দাবি না মানায় শিক্ষকদের অবরুদ্ধ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতদের হামলার ঘটনার পর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের গতকাল সোমবার সকাল ৯টার মধ্যে হলত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডিকে পদত্যাগসহ ছয় দাবিতে তারা বিক্ষোভ করছেন।

বাকৃবিতে কম্বাইন্ড (সমন্বিত) ডিগ্রি চালুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন ভেটেরিনারি অনুষদ এবং পশু পালন অনুষদের শিক্ষার্থীরা। রোববার একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এ নিয়ে চূড়ান্ত সমাধান না আসায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যসহ দুই শতাধিক শিক্ষককে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনে অবরুদ্ধ করেন। মিলনায়তনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে রাত পৌনে ৮টার দিকে লাঠিসোটা ও দা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বহিরাগতরা। এতে অন্তত চার শিক্ষার্থী আহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রোববার রাতে জরুরি সিন্ডিকেট সভা করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করে এবং শিক্ষার্থীদের সকাল ৯টার মধ্যে হলত্যাগের নির্দেশ দেয়। এই সিদ্ধান্তকে ‘স্বৈরাচারী’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন শিক্ষার্থীরা।

তাদের অভিযোগ, হামলায় কয়েক শিক্ষক জড়িত। তারা ‘বহিরাগত গুন্ডাবাহিনী’ দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গতকাল রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিনের সই করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অবরুদ্ধ শিক্ষকদের উদ্ধারের জন্য তাদের স্বজন, বয়োবৃদ্ধ বাবা-মা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা এসেছিলেন। তাদের ভুলভাবে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করে শিক্ষার্থীদের উস্কে দেওয়া হয়েছে।

ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, ছয় দফা দাবি
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশে গতকাল সকাল থেকে বেশ কয়েক শিক্ষার্থী হল ছাড়েন। তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী এই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে সকাল ৮টা থেকেই বিভিন্ন হল থেকে লাঠিসোটা হাতে মিছিল বের করেন। তারা ক্যাম্পাস-সংলগ্ন কে আর মার্কেটে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং হল ছাড়বেন না বলে দৃঢ় অবস্থান জানান।

ছাত্রীদের হল, যেমন বেগম রোকেয়া ও জুলাই ৩৬ হলের কিছু শিক্ষার্থী পরিবার ও নিরাপত্তার ভয়ে ক্যাম্পাস ছাড়লেও সিংহভাগ শিক্ষার্থী আন্দোলনে যোগ দেন। ঈশা খাঁ হলের ছাত্ররা জানান, রাতের আঁধারে এমন নোটিশ দিয়ে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়াটা এক ধরনের স্বৈরাচারী আচরণের পুনরাবৃত্তি।

শিক্ষার্থীরা ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন। সেগুলো হলো– একক ডিগ্রি, অর্থাৎ কেবল কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালু রাখতে হবে; বহিরাগতদের দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করায় সম্পূর্ণ প্রক্টরিয়াল বডিকে পদত্যাগ করতে হবে; বহিরাগতরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করার ঘটনায় উপাচার্যকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না এই নিশ্চয়তা দিতে হবে। যেসব শিক্ষক এ হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে; অবিলম্বে হলত্যাগের নির্দেশনা প্রত্যাহার এবং হলগুলোতে সব সুবিধা নিশ্চিত করা।

গতকাল সোমবার দুপুর ১২টায় শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এ এইচ এম হিমেল উপাচার্যকে দুপুর ২টার মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম দেন। এ সময় তিনি বলেন, শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ মদদে ‘বহিরাগত গুন্ডা ও টোকাই বাহিনী’ এসে আমাদের ওপর হামলা করেছে। বহিরাগত এসব সন্ত্রাসীর চেহারা গণমাধ্যমে স্পষ্টভাবে এসেছে। তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ অবরোধ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় বিকেল ৪টার দিকে ময়মনসিংহের জব্বারের মোড়ে রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চিফ ইন্সপেক্টর সিরাজুল ইসলাম জানান, অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেন ময়মনসিংহ স্টেশনে এবং আন্তঃনগর মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ফাতেমানগর স্টেশনে আটকা পড়ে। পরে অবরোধ তুলে নিলে সন্ধ্যা ৭টার পর রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দেওয়া এহসানুল হক হিমেল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কেআর মার্কেটে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ মদদে আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। পরে শিক্ষকরা যে বিবৃতি দিয়েছেন, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছি। 

তিনি আরও বলেন, আমরা হল ছাড়ব না। প্রশাসন যদি আমাদের হলের গ্যাস-বিদ্যুতের লাইন যদি বন্ধ করে দেয়, তাহলে সব শিক্ষার্থী মিলে শিক্ষকদের বাসার গ্যাস-বিদ্যুতের লাইন বন্ধ করে দেব। আমাদের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

প্রশাসন যা বলছে
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুনির হোসাইন সমকালকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক। রোববার বহিরাগতরা হামলা চালানোয় ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ইন্ধন ছিল না। তবে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্ত না মেনে অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন দুঃখজনক। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। আশা করছি, শিক্ষার্থীরা বিষয়টি অনুধাবন করে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে ফিরে আসবে। 

এদিকে ক্যাম্পাসের প্রবেশপথে পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ক্যাম্পাসের ভেতরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। র‍্যাব-১৪ এর কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান জানান, তারা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সতর্ক রয়েছেন।