দেশে বর্তমানে ৪১টি জেলার ৯০টি উপজেলায় ১৫০ জনের বেশি প্রান্তিক মুক্তা চাষি আছেন। তাঁদের মাধ্যমে প্রায় ছয় লাখ ঝিনুক চাষ হচ্ছে। এসব ঝিনুক থেকে উৎপাদিত মুক্তা অলংকার তৈরির কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। কেউ কেউ অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও সরাসরি মুক্তা বিক্রি করছেন।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষকদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বছর দুয়েক আগে আমি পটুয়াখালী জেলায় কাজ করতে যাই। সেখানে কুয়াকাটা সদর উপজেলার ধুলাশার গ্রামের এক তরুণের সঙ্গে আমার দেখা হয়, যিনি ঝিনুকে মুক্তা চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
তরুণের নাম সুজন হাওলাদার।
তিন বছর আগে তিনি মুক্তা চাষে যুক্ত হন। বর্তমানে তাঁর তিনটি পুকুরে পুরোদমে মুক্তা চাষ চলছে।
পুকুরের মাঝখানে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বিশেষ কৌশলে জালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ঝিনুক। পুকুরজুড়ে সারি সারি প্লাস্টিকের বোতল ভাসছে।
মূলত পুকুরের তলদেশ থেকে ঝিনুক ঝুলিয়ে রাখার জন্যই এই বোতল ব্যবহার করা হয়। ঝিনুকের ভেতরেই চাষ হয় মুক্তা। সুজন হাওলাদার আমাকে দেখানোর জন্য পুকুর থেকে কয়েকটি ঝিনুক তুলে আনেন। তিনি দেখান, কিভাবে ঝিনুকের ভেতরে ডাইস বা ওষুধ প্রয়োগ করে মুক্তা তৈরি করা হয়। একে তাঁরা ‘সার্জারি’ও বলেন।
সুজন সাধারণত দুই ধরনের মুক্তা তৈরি করেন। একটি অলংকার বা নাম আকৃতির ডাইস দিয়ে তৈরি, যাকে ‘ইমেজ পার্ল’ বলা হয়, আর অন্যটি গোলাকার মুক্তা।
সুজনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, মুক্তা চাষ সম্পর্কে তাঁর ধারণা বেশ ভালো। তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মুক্তা উৎপাদন করেছেন। মুক্তা চাষের পুরো প্রক্রিয়া বেশ সময়সাপেক্ষ। মাছ চাষের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফসল হিসেবে তিনি মুক্তা চাষ করছেন। এ কারণেই তাঁর কাছে এটি বেশ লাভজনক মনে হয়। জাল, দড়ি ইত্যাদিসহ প্রতিটি ঝিনুকের বার্ষিক খরচ পড়ে প্রায় ২০ টাকা। প্রতিটি ঝিনুক থেকে পাওয়া মুক্তা মানভেদে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। অর্থাৎ প্রতি ঝিনুকে ন্যূনতম লাভ দাঁড়ায় বছরে অন্তত ২৮০ টাকা। সুজনের পুকুরে রয়েছে চার হাজার ৫০০টি ঝিনুক। সেই হিসাবে এক বছরে তাঁর লাভ ১২ লাখ টাকার বেশি।
অনেক তরুণকেই মুক্তা চাষ স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছে। এটি দেখে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা মুক্তা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তবে মুক্তা চাষ টেকসই করতে হলে উদ্যোক্তাদের মুক্তার বাজার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। পাশাপাশি উচ্চমানের মুক্তা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উন্নতমানের ঝিনুক। ভালো ঝিনুক প্রজাতি উদ্ভাবনে গবেষণাও জরুরি। নেদারল্যান্ডসে আমি বড় আকারের ঝিনুক খামার দেখেছি, যেখানে উচ্চমানের ঝিনুক উৎপাদন করা হয়।
ঝিনুকের ভেতরই জন্ম নেয় এক মূল্যবান রত্ন। তবে সব ঝিনুকে মুক্তা হয় না। মুক্তা চাষে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞান। বিশেষ করে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তা উৎপাদন করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রযুক্তি সম্পর্কে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
সুজন বলেন, মুক্তা চাষ ও বিপণনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী মুক্তার নকশা কেটে দেওয়ার দক্ষতা। এই কৌশল ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালু করেছেন রংপুরের লালমনিরহাট সদর উপজেলার মুক্তা চাষি রুহুল আমিন লিটন। তিনি এটি শিখেছেন ভারত থেকে। সুজনের মতে, সরকার যদি উৎপাদন কৌশল থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত ঝিনুক চাষের প্রতিটি ধাপে প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করে, তাহলে মুক্তা চাষ আরো টেকসই হবে এবং এ খাতে ব্যাপক সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।
বাংলাদেশে মুক্তা চাষের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশের নদী-নালা, হাওর, বিল ও পুকুরের মতো বিস্তৃত মিঠা পানির জলাশয় স্বাভাবিকভাবে মুক্তা উৎপাদনের উপযোগী। বিশেষ করে মুক্তা চাষের জন্য প্রয়োজনীয় উষ্ণ আবহাওয়া ও পানির গুণগত মান দেশের বহু অঞ্চলে বিদ্যমান, যা স্বল্প বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি লাভের সুযোগ তৈরি করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মুক্তা চাষ করলে এটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র হতে পারে, পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গয়নাশিল্পকে সমৃদ্ধ করার সম্ভাবনাও রয়েছে। ঝিনুকের ভেতর মুক্তা তৈরির গল্প নতুন নয়। গয়নাশিল্পে মুক্তার ব্যবহারও বহু পুরনো। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত মূল্যবান রত্নের তালিকায় মুক্তার অবস্থান শীর্ষ সারিতে। ওষুধ ও প্রসাধনী শিল্পেও মুক্তার ব্যবহার রয়েছে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক দেশে ব্যাপকভাবে মুক্তা চাষ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশেও বহু আগেই মুক্তা চাষ শুরু হয়েছে। ঝিনুকের মাধ্যমে মুক্তা চাষ একটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি।
সুজন হাওলাদারের মতো তরুণরা যেভাবে মুক্তা চাষকে এগিয়ে নিচ্ছেন, তাতে অন্য উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসবেন। এর মাধ্যমে বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। আশা করা যায়, সরকার এ বিষয়ে আরো পরিকল্পিত ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেবে।























