থরে থরে সাজানো ছোট-বড় মাছ। কোনোটির ওজন পাঁচ-ছয় কেজি আবার কোনোটির এক-দেড় মণ। ছিল পাবদা, গুলশা, গলদা চিংড়ি, বাইম, কাইক্কা, রূপচাঁদাসহ নানা প্রজাতির ছোট-বড় সব মাছ। কেউ এসেছিলেন পছন্দের মাছটি কিনতে, কেউ আবার পরিবার নিয়ে ঘুরে দেখতে।
গতকাল বুধবার নানা প্রজাতির মাছের এমন মেলা বসেছিল গাজীপুরের কালীগঞ্জের বিনিরাইল গ্রামের জামাইমেলায়। তবে মেলার মূল আকর্ষণ ছিল ১১৮ কেজির শাপলাপাতা ও ৩৫ কেজির বোয়াল মাছ। মেলায় মাছ ছাড়াও দেশীয় আসবাব, খেলনা, মিষ্টির দোকানও ছিল।
জামাইমেলা ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ জামাই ভিড় করেন নরসিংদীর রায়পুরার মাছ ব্যবসায়ী মাখন দাসের দোকানে।
তাঁর দোকান ঠাসা ছিল ২০ থেকে ৪৫ কেজি ওজনের কাতল, সাত থেকে ১৩ কেজির চিতল, আট থেকে ১৭ কেজির কোরাল, ৩৫ কেজির বোয়াল, বড় বড় আইড়সহ নানা প্রজাতির মাছে। মাখন দাস ৪৫ কেজির কাতল মাছটির দাম হাঁকছিলেন এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। গাজীপুরের জামাই অজিত সাহা মাছটির দাম দিতে চান ৭৫ হাজার টাকা। বিক্রেতা অপেক্ষা করছিলেন আরো বেশি দাম পাওয়ার আশায়।
মাখন দাস ৩৫ কেজির বোয়াল মাছটির দাম হাঁকেন ৭০ হাজার টাকা। জামাই কালীগঞ্জের চুপাইর গ্রামের শফিকুল হক ৪৫ হাজার টাকা দাম বললেও তাতে রাজি হয়নি বিক্রেতা। ক্রেতা কম দামে মাছ কিনতে চাইলেও বিক্রেতা চেষ্টা করছিলেন একটু বাড়তি দাম পাওয়ার। তবে মাছের ক্রেতার চেয়ে ভিড় বেশি ছিল মাছ দেখার জন্য। চট্টগ্রামের মাছ ব্যবসায়ী রিপন দাসের দোকানের মূল আকর্ষণ ছিল ১১৮ কেজির শাপলাপাতা মাছ।
তিনি মাছটির দাম চাইছিলেন এক লাখ ১৮ হাজার টাকা। বিকেল ৩টা পর্যন্ত মাছটির দাম ওঠে ৫৬ হাজার টাকা। তবে তাঁর দোকানের পাঁচ-সাত কেজি ওজনের রুই ছাড়াও বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, কালবাউশ, পাবদা, গুলশা, গলদা চিংড়ি, সামুদ্রিক বাইম, কাইক্কা,
রূপচাঁদাসহ নানা প্রজাতির মাছের বিক্রি ছিল জমজমাট।
জামাই-শ্বশুরের মাছ কেনার উৎসববিনিরাইল গ্রামের বাসিন্দা গাজীপুরের একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক মো. আশরাফুল ইসলাম হাসিমুখে ফিরছিলেন ১০ কেজির আইড় মাছ নিয়ে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগেই শ্যালিকাকে বিয়ে দিয়েছেন। বাড়িতে নতুন জামাই। জামাইয়ের জন্য শ্বশুরের সঙ্গে মেলায় এসেছিলেন মাছ কিনতে। আইড় মাছটির দিকে তাকিয়ে বললেন, বিক্রেতা দাম চেয়েছিলেন ৫৫ হাজার টাকা। দামাদামির পর মাছটি ২৯ হাজার টাকায় কিনেছেন। তাঁর শ্বশুরও প্রায় ২০ হাজার টাকার বেশ কিছু মাছ কিনেছেন বলে জানালেন। তিনি জানান, বিনিরাইলের এই মেলা এক ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। প্রতিবছর গাজীপুর ছাড়াও টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ থেকেও অসংখ্য মানুষ মাছ কিনতে আসেন এখানে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। বিক্রেতা রিপন দাস বলেন, ‘৪০ বছর ধরে এই মেলায় মাছ বিক্রি করি। এ বছর বিক্রি বেশ ভালো হয়েছে। তার চেয়ে ভালো ছিল ব্যবস্থাপনা। অন্য বছর চাঁদা দিতে হতো। এবার চাঁদা দিতে হয়নি। কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলা থেকে আসা মাছ ব্যবসায়ী নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডল (৫৬) বলেন, ২৫ বছর ধরে তিনি এই মেলায় মাছ বিক্রি করেন। প্রতিবছরই বহু মানুষের সমাগম ঘটে মেলায়। বিক্রিও হয় প্রচুর। ঐতিহ্যের কারণে বিনিরাইলের জামাইমেলায় প্রচুর মানুষ আসে। বিক্রিও ভালো হয়। তবে দল-মত-নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষকে এই মেলায় এককাতারে শামিল করতে পারাটাই আয়োজকদের আসল সার্থকতা। বিনিরাইলের পাশের চুপাইর গ্রামের প্রবীণ মো. এরশাদউল্লাহ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এ মেলা দেখে আসছি। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, তাঁরাও ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন এই মেলা। তবে আগে হিন্দু সম্প্রদায়ের জামাই-শ্বশুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল মেলা। এক-দেড় যুগ ধরে এই মেলা সর্বজনীন রূপ নিয়েছে।’
এরশাদউল্লাহর নাতি স্কুল শিক্ষক মো. আশরাফ হোসেন বলেন, ‘মেলায় শুধু জামাইরাই মাছ কেনেন, এমনটা নয়। আসেন শ্বশুরসহ সাধারণ মানুষও। তবে সবার নজর থাকে বড় মাছটার দিকেই।’ জামাইমেলা সম্পর্কে কালীগঞ্জের বাসিন্দা ঠিকাদার মো. মুজিবুর রহমান (৪৮) জানান, তিনি চিতল, বোয়াল, আইড়সহ সব মিলিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির ৭০ হাজার টাকার মাছ কিনেছেন। একসঙ্গে অনেক মাছ কম দামে পাওয়া যায় বলে প্রতিবছর এই মেলায় আসেন।
বিনিরাইলের জামাইমেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি মো. আলী হোসেন বলেন, প্রতিবছর পৌষ মাসের শেষে মাঘ মাসের প্রথম দিন বসে এই মেলা। মেলার বয়স ২৬২ বছরের বেশি। সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে মেলাটি একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। তাঁর ধারণা, এবার বিক্রি আড়াই কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাতে পারে। বুধবার সকাল থেকে শুরু হওয়া মেলা শেষ হয়েছে মধ্যরাতে।























