ঢাকা   মঙ্গলবার
১৩ জানুয়ারি ২০২৬
২৯ পৌষ ১৪৩২, ২৪ রজব ১৪৪৭

প্লাস্টিক বর্জ্যে মাছের মৃত্যু

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৮:২০, ১১ জানুয়ারি ২০২৬

প্লাস্টিক বর্জ্যে মাছের মৃত্যু

বাংলাদেশসহ পৃথিবীজুড়ে নদী-সমুদ্র এখন এক গভীর সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে প্লাস্টিকদূষণ। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে মানুষ যত বেশি আধুনিক হয়েছে, ততই প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। 

মানুষের সুবিধার জন্য তৈরি এই বস্তুটি ধীরে ধীরে প্রকৃতির জন্য দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নদীর জলজ প্রাণীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেসব নদী এক সময় মাছের স্বর্গরাজ্য ছিল, আজ সেগুলোর তলদেশে জমছে স্তরে স্তরে প্লাস্টিক। নদীর স্বচ্ছ জল এখন কালচে, দুর্গন্ধযুক্ত এবং প্রাণশূন্য হয়ে পড়ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য সরাসরি মাছের শরীরে ঢুকে মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি জটিল হলেও খুবই বাস্তব।

মাছ সাধারণত জলের ভেতর ভাসমান ছোট ছোট বস্তু শনাক্ত করে খাবার সংগ্রহ করে। যখন খাবারের মতো দেখতে বিভিন্ন প্লাস্টিক কণা পানিতে ভাসে, তখন মাছ সেগুলোকে খাবার ভেবে গিলে ফেলে। একটি ছোট প্লাস্টিক কণাও মাছের পেটে গিয়ে জমে থাকলে তা ধীরে ধীরে আকার বাড়ায় এবং মাছের হজম প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে। মাছ খাবার খেতে পারে না, দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত অপুষ্টিতে মারা যায়। 

আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, প্লাস্টিক যখন দীর্ঘদিন পানিতে থাকে, তখন তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এই ক্ষুদ্র কণাগুলো এত ছোট যে মাছ তা চিনতেই পারে না। মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছের রক্তে ও শরীরে প্রবেশ করে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, প্রজননক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও জেনেটিক প্রভাব ফেলে।

মানুষের অসচেতনতার পাশাপাশি অবকাঠামোগত দুর্বলতাও এই সমস্যার অন্যতম কারণ। শহরে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই, অনেক বাজারে বর্জ্য আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা নেই। মানুষ তাই স্বাভাবিকভাবেই বর্জ্য রাস্তা বা ড্রেনে ফেলে দেয়, যা পরে নদীতে গিয়ে পড়ে। 

সমাধানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন প্লাস্টিক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর জন্য সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণ সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। বাজারে যদি পরিবেশবান্ধব ব্যাগ সহজলভ্য করা হয়, তাহলে মানুষ স্বভাবতই সেটির দিকে ঝুঁকবে। প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ করতে হলে কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, পাশাপাশি উন্নত বিকল্পও দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কাগজের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ বা চার-পাঁচবার ব্যবহারযোগ্য মোড়ক জনপ্রিয় করতে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। দোকানগুলোকে পরিবেশবান্ধব ব্যাগে পণ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করলেও পরিস্থিতি অনেক বদলে যাবে।

বিদ্যমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে হবে। একটি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু শহর নয় গ্রামেও প্রয়োজন। প্রতিটি ওয়ার্ডে প্লাস্টিক আলাদা করে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা, নদী-খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে কড়া শাস্তি এবং নিয়মিত পরিষ্কার অভিযান এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করলে নদী অনেকাংশে বাঁচতে পারে। 

আরশী আক্তার সানী: গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
arshieakter205@gmail.com

সর্বশেষ