ঢাকা   সোমবার
১১ মে ২০২৬
২৭ বৈশাখ ১৪৩৩, ২৪ জ্বিলকদ ১৪৪৭

পিয়ালি উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় মাছ

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ

প্রকাশিত: ১০:৩৯, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

পিয়ালি উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় মাছ

বাংলাদেশে মিঠা পানির ও সামুদ্রিক মাছের প্রায় ৮০০ প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে ২৬১টি মিঠা পানির মাছ। দেশের বেশির ভাগ মানুষ মিঠা পানির মাছ খেয়ে অভ্যস্ত। এসব মিঠা পানির মাছের মধ্যে বিরাট অংশজুড়ে আছে ছোট প্রজাতির মাছ।

তথ্য মতে, দেশে মিঠা পানিতে ছোট মাছের সংখ্যা ১৪৩টি।

প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির খাদ্য তালিকায় ছোট মাছের রয়েছে বিশেষ অবদান। ছোট মাছ বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছোট মাছের মধ্যে পিয়ালি উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় মাছ।

উত্তরবঙ্গে পিয়ালি ছাড়া মেহমানদারি পূর্ণতা পায় না। এটি Cyprinidae পরিবারের অন্তর্গত Aspidoparia গণের মিঠা পানির একটি সুস্বাদু মাছ; যার বিস্তৃতি বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার ও নেপালে। এই মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Aspidoparia jaya (Hamilton,1822) ও ইংরেজি নাম ঔধুধ। পিয়ালি মাছকে অঞ্চলভেদে পিউলি, জয়া বা পিয়াসি নামেও ডাকা হয়।
বাংলাদেশের পরিপক্ব পিয়ালির দৈর্ঘ্য ৮-১০ সেমির মধ্যে হয়ে থাকে। মাছের দেহ রুপালি চকচকে ও লম্বাটে এবং পার্শ্বীয়ভাবে চাপা। মুখ নিম্নমুখী ও নিচের চোয়াল অর্ধচন্দ্রাকার। এই মাছের শরীরের আঁইশ প্রতিবছর ঝরে পড়ে এবং নতুন আঁইশ গজায়। সমবয়সী পরিপক্ব পুরুষ মাছ স্ত্রী মাছের চেয়ে আকারে কিছুটা বড়।

যমুনা, পদ্মা এবং এদের শাখা নদীতে (মহানন্দা, আত্রাই, বাঙ্গালি ইত্যাদি) পিয়ালি মাছের বিস্তৃতি রয়েছে। তবে যমুনায় এদের প্রাপ্যতা বর্তমানে বেশি বলে অনেকে মনে করেন। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মাছটি সংকটাপন্ন মাছের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ে এর প্রাচুর্যতা ব্যাপকহারে কমেছে। প্রজাতিটিকে প্রকৃতিতে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা এবং চাষের জন্য পোনার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে এর কৃত্রিম প্রজনন, নার্সারি ব্যবস্থাপনা ও চাষ কলাকৌশল বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্লাবনভূমি উপকেন্দ্র, সান্তাহার, বগুড়া থেকে ২০২০ সালে দেশে প্রথম উদ্ভাবন করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পিয়ালি মাছের ডিম ধারণক্ষমতা আকারভেদে এক হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৫০০টি। এরা বর্ষাকালে অগভীর পানিতে প্রজনন করে থাকে।

পিয়ালি মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম হচ্ছে মে থেকে আগস্ট এবং ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি অর্থাৎ বছরে দুইবার এরা প্রজনন করে। কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রজনন মৌসুমের আগে প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে সুস্থ-সবল ও রোগমুক্ত পিয়ালি মাছ সংগ্রহ করে পুকুরে প্রতিপালন করতে হয়। প্রতিপালন পুকুরের আয়তন সাধারণত ২০ শতাংশ ও গড় গভীরতা ১.৫ মিটার রাখা হয়। পুকুরে ছয়-সাত মাস পালনের পর পিয়ালি মাছ প্রজননক্ষম হয়ে ওঠে। পিয়ালি প্লাংকটনজাতীয় খাবার খায় এবং পুকুরে মাছটি দ্রুত বাড়ে। মিশ্রচাষে পিয়ালির পুকুর থেকে বেশি লাভবান হওয়া যায়। উল্লেখ্য, দেশে পিয়ালির চাষ এখনো বিস্তার লাভ করেনি।

নদ-নদীতে পিয়ালি মাছ সারা বছর সমানভাবে পাওয়া যায় না। বর্ষার পানিতে তিন-চার মাস পিয়ালি অপেক্ষাকৃত বেশি ধরা পড়ে। তার মানে এই না, এ সময় বাজারে গেলেই পিয়ালি মাছ পাওয়া যাবে। আর বেশি পরিমাণে ধরা পড়লে বেশির ভাগ সময় তা সরাসরি ঢাকায় অভিজাত এলাকার নির্ধারিত ভোজনরসিকদের পাতে চলে যায়। পিয়ালি ধরার বিশেষ জাল হচ্ছে ভেসাল জাল ও বেড় জাল। ভালো সাইজের পিয়ালির দাম কেজিপ্রতি ১০০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। কোনো কোনো সময় এক হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। উত্তরবঙ্গে পিয়ালির ন্যায় দেখতে একই আকারের বৈরালি নামে আরেকটি সুস্বাদু মাছ রয়েছে। তাই অনেকে ভুলবশত পিয়ালির বদলে বৈরালি খেয়ে পিয়ালির স্বাদ মেটান। কিন্তু বাহ্যিকভাবে পিয়ালি এবং বৈরালির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হচ্ছে বৈরালির পৃষ্ঠদেশ বরাবর সমান্তরালে লম্বালম্বিভাবে ফোঁটা ফোঁটা কালো দাগ আছে, যা পিয়ালিতে নেই। তা ছাড়া, পিয়ালি তুলনামূলকভাবে একটু লম্বাটে। উত্তরবঙ্গবাসী পিয়ালি মাছকে চচ্চড়ি হিসেবেই খেতে পছন্দ করে।

পিয়ালি অণুপুষ্টি সমৃদ্ধ একটি মাছ। প্রতি ১০০ গ্রাম মাছে মিথিয়োনিন ৭৫০ মিলিগ্রাম, সিস্টিন ৪২০ মিলিগ্রাম, পটাসিয়াম ৪৩০ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৬৭০ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ১৫০ মিলিগ্রাম, জিংক ১২.৮ মিলিগ্রাম, আয়রন ২৫ মিলিগ্রাম, ম্যাংগানিজ ৮.২১ মিলিগ্রাম, এবং ১.৪০ শতাংশ কপার রয়েছে, যা অন্য অনেক দেশি ছোট মাছের তুলনায় বেশি। রাতকানা রোগ প্রতিরোধ এবং পটাসিয়াম ও ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে এই মাছ অত্যন্ত উপকারী। বাড়ন্ত শিশু ও অন্তঃসত্ত্বাদের জন্য পিয়ালি মাছ অন্যতম পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার।

পিয়ালি উত্তরবঙ্গে অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় মাছ হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এই মাছটি অনেকে চেনে না। দেশের মিঠা পানি অঞ্চলে এই মাছটির প্রজনন ও চাষপ্রযুক্তি বাড়ানো গেলে সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারিতে পিয়ালির পোনা প্রাপ্যতা নিশ্চিত হবে এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চাষের মাধ্যমে প্রজাতিটির উৎপাদন বাড়ানো যাবে। এতে সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে মাছটি সুরক্ষিত হবে।