কুষ্টিয়ার খোকসায় কীটনাশক ব্যবসায়ীর ভুলে আমন ধানের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে ১০ চাষির। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলে সালিশ বসান স্থানীয় বিএনপি নেতারা। সেখানে ওই ব্যবসায়ী চার কৃষকের ক্ষতির বিষয়ে স্বীকার করেন। এ জন্য বিঘাপ্রতি তাঁকে সাত হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অথচ প্রতি বিঘায় কৃষকর রোপণ খরচই হয়েছে ৯ হাজার টাকার মতো। এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিলেও বেশির ভাগ কৃষকেই মুখ বন্ধ রেখেছেন। কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাটক্ষেতের আগাছানাশক ধানক্ষেতে স্প্রে করায় ওই কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর মধ্যপাড়া ও চাঁদট গ্রামের বাসিন্দা। গতকাল সোমবার সকালে সরেজমিন কৃষকদের ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। রোববার রাতে চাঁদট বাজারে অবস্থিত কীটনাশক ব্যবসায়ী জাহিদ মণ্ডলের দোকানে সালিশ বসিয়েছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।
কৃষকরা জানান, সপ্তাহ দুয়েক আগে ওই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভবানীপুর মধ্যপাড়া ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদট গ্রামের ১০ জন চাষি পর্যায়ক্রমে জাহিদ মণ্ডলের কাছে ধানক্ষেতের আগাছানাশকের জন্য যান। তিনি ধানক্ষেতের আগাছানাশক উইডক্লিনের বদলে সবাইকে উইডনীল নামের ওষুধ স্প্রে করতে দেন। এটি ওষুধ পাটক্ষেতে স্প্রে করার জন্য। এতে সবার জমির ধানগাছ নষ্ট হয়ে গেছে।
১০ সেপ্টেম্বর প্রথম জাহিদের কাছ থেকে ওষুধ কিনেছিলেন ভবানীপুর মধ্যপাড়ার আব্দুল কুদ্দুস। সোমবার সকালে জমির আলে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। দুই বিঘা জমি আবাদে তাঁর খরচ হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। এতে ৩০ মণ ধান উৎপাদনের আশা করছিলেন। যা বাজারে বিক্রি করে পেতেন ৩৫ হাজার টাকা। কিন্তু নেতারা বিঘাপ্রতি সাত হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছেন।
জমির ধানগাছ দেখিয়ে বলেন, সবই পচে শেষ হয়ে গেছে। এ বছর ছেলেমেয়েদের পেট ভরবে কী দিয়ে? মহাজন (কীটনাশক ব্যবসায়ী) লাভের জন্য নিম্নমানের ওষুধ দিয়েছেন। বিএনপি নেতা সালিশ করে দিয়েছেন, তাই বাধ্য হয়ে মেনে নিয়েছেন। বাকি বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেন।
একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদট গ্রামের বাসিন্দা আনিস মোল্লা, তাঁর ভাই টুটুল ও একই গ্রামের হামিদুল্লাহ ও রহমত আলীসহ ১০ কৃষক। তাদের সবার জমির ধানই লাল হয়ে মরতে শুরু করেছে। আনিস মোল্লা ওই গ্রামের রাসেল হোসেনের দেড় বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন। রাসেলের ভাষ্য, সালিশে ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা দিয়ে ধান রোপণের খরচই হয় না। এখন জমির মালিক কী নেবে, আর বর্গাচাষিকে কি দেবেন?
চাঁদট বাজারের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী জাহিদ মণ্ডল ভুল ওষুধ দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, চারজন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যস্থতায় ওই কৃষকদের বিঘাপ্রতি ক্ষতিপূরণ দিতেও তিনি রাজি হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে ১০ জন কৃষকের ক্ষতির কথা জানা গেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনের নাম আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যরা নাম প্রকাশে রাজি হননি। বেতবাড়িয়া ইউপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ফারুক হোসেনের ভাষ্য, ভুল কীটনাশক স্প্রে করায় কৃষকের ক্ষতি হয়েছে। তাদের কাছ থেকে মৌখিকভাবে শুনেছেন।
রোববার রাতের সালিশে স্থানীয় বিএনপি নেতা ঝন্টু বিশ্বাস, নিয়ামত আলী, রেজাউল, আল আমীন, সিয়াম বিশ্বাস ও শহিদুল মাস্টার অংশ নেন। তাদের মধ্যে ঝন্টু বিশ্বাস বিষয়টি নিশ্চিত করে এই প্রতিবেদকে মোবাইল ফোনে বলেন, তারা ব্যবসায়ীর ঘরে কৃষকদের নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। ওই ব্যবসায়ী ভুলে উইডক্লিনের বদলে উইডনীল আগাছানাশক দিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেন। কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা সালিশে ধার্য ক্ষতিপূরণের কয়েকগুণ বেশি বলেও স্বীকার করেন। এ নিয়ে সংবাদের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না।
একজন কৃষকের কাছ থেকে ফোনে বিষয়টি জেনেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল নোমান। তাঁর ভাষ্য, উইডক্লিন ধানক্ষেতের আগাছা নির্মূলে কাজ করে। আর উইডনীল পাটক্ষেতের আগাছা নির্মূল করে। দোকানির ভুলেই এই ঘটনা ঘটেছে। তিনি জেনেছেন ক্ষতির শিকার কৃষক একজনই। সূত্র: সমকাল























