বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে নতুন করে ৬৫টি জলজ প্রাণীর প্রজাতির সন্ধান মিলেছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মাছ আহরণ, ‘সোনার ফিশিং’ ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমে ভারসাম্যহীনতার চিত্র উঠে এসেছে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক জরিপে। এসব বাস্তবতায় গভীর সমুদ্রের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় গবেষণা, তথ্যভিত্তিক নীতি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এক বৈঠকে আর-ভি ডক্টর ফ্রিডটিয়ফ নানসেন পরিচালিত গভীর সমুদ্র জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের দেশের স্থলভাগ যতটুকু, সমপরিমাণ অঞ্চল জলভাগেও রয়েছে। কিন্তু এ সম্পদ আমরা এখনও সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। এমনকি সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও সম্ভাবনা কী, সেটাও পুরোপুরি জানা হয়নি। এ সম্পদ কাজে লাগাতে হলে গবেষণা ও শক্ত নীতিগত সহায়তা দরকার।
বৈঠকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের গবেষক সায়েদুর রহমান চৌধুরী জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এ জরিপে আটটি দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানী অংশ নেন। এর মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশের। জাতিসংঘের একটি গবেষণা জাহাজ এ জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে বঙ্গোপসাগরের ৬৮টি স্টেশন থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে দেশের সমুদ্রসীমায় নতুন আরও ৬৫ প্রজাতির মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে পাঁচ প্রজাতির মাছ সারা বিশ্বের মধ্যে প্রথম দেখা গেছে। এত দিন সাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। আগের প্রজাতির সঙ্গে এখন নতুন করে এসব মাছের প্রজাতি যুক্ত হবে। এসব মাছের পূর্ব ইতিহাস এবং গোত্র নির্ধারণের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। আবার প্রথমবারের মতো দেশের সমুদ্রসীমায় টুনা মাছের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষণার উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরে সায়েদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের আধিক্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এটি ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ। তাঁর ভাষায়, অতিরিক্ত মাছ আহরণ বা ওভারফিশিংয়ের কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া দুই হাজার মিটার গভীরতায় প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালের জরিপের তুলনায় গভীর সমুদ্রে বড় মাছের সংখ্যা কমেছে। আর স্বল্প গভীর পানিতে মাছের ঘাটতি পৌঁছেছে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে।
জরিপের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘সাগরের ৮০ থেকে ৯০ মিটারের পর অক্সিজেনের মাত্রা কম। কিছু জায়গায় অক্সিজেন নেই বললেই চলে। তবে সাগরে প্রচুর উদ্ভিদের উপস্থিতি দেখা গেছে। আমাদের জাহাজ সাগরের উপকূলের ২০ মিটারের নিচে নামতে পারে না। তাই উপকূলের কোনো তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি।’
মৎস্য উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, টার্গেটেড ফিশিং চলতে থাকলে বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ‘সোনার ফিশিং’ বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে।
গবেষণায় বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে টুনা মাছের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার তথ্য পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে সুন্দরবনের নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিশিং নার্সারি শনাক্ত করা হয়েছে। বৈঠকে জানানো হয়, এই নার্সারি সংরক্ষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে মাছের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা যায়।
প্রধান উপদেষ্টা জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও তথ্য বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। যাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান আছে, তাদের সঙ্গে গবেষণা সমন্বয় করতে হবে। এর মধ্য দিয়েই অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন সম্ভব।























