‘একসময় খুব কষ্টে ছিলাম। ১৫ বছর আগে কৃষি খামার করে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন শুরু করি। বাড়ির সামনে দেড় একর জমিতে আমার এবং বাড়ি থেকে একটু দূরে তিন একর জমিতে স্বামী সবজি বাগান করেন। রাসায়নিক সার ছাড়া শুধু হলুদ স্টিকার, আঠালো ফাঁদ, নিমের রসসহ বিভিন্ন জৈব সার ব্যবহার করে সবজি চাষ করি। আমাদের দেখাদেখি অনেকে এভাবে চাষ করায় এই গ্রামটা এখন সবজির গ্রাম হয়ে গেছে।’ পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের উদ্যোক্তা জুলেখা বেগম এসব কথা বলেন।
তাঁর স্বামী জয়নাল আবেদীন হাওলাদার জানান, ২০১২ সালের ঘটনা। বড় মেয়ে মুক্তা বেগমের বয়স তখন ১৩ বছর। জরায়ুতে দেড় কেজি ওজনের টিউমার ধরা পড়ে। ততদিনে টিউমার রূপ নিয়েছে ক্যান্সারে। সবজি বেচে ঢাকায় অস্ত্রোপচার করে টিউমার ফেলে দেওয়া হয়। এরপর আট মাস চিকিৎসা শেষে ক্যান্সারমুক্ত হয়। চিকিৎসক জানিয়ে দেন, মেয়েটি সন্তানের মা হতে পারবে না। ২০১৮ সালে বিয়ে হয়। চিকিৎসকের অনুমান ভুল প্রমাণ করে বিয়ের এক বছরের মধ্যে তার ঘরে জন্ম নেয় কন্যাসন্তান।
আন্ধারমানিক নদীর কোল ঘেঁষে কুমিরমারা খালের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের গ্রাম সোনাতলা। স্থানীয়ভাবে এটি এখন পরিচিত বিষমুক্ত সবজির গ্রাম নামে। এখানে অনেকে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায়ে চাষ করছেন মৌসুমি সবজি। এই গ্রামে প্রথম বিষমুক্ত সবজি চাষের উদ্যোক্তা জয়নাল ও জুলেখা দম্পতি। একসময়ের দরিদ্র এই দম্পতি ২০১০ সালে এই চাষ শুরু করেন। এর মাধ্যমে শুধু নিজেদের ভাগ্য বদলাননি; গ্রামের অন্য কৃষকদেরও সমানভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, মুক্তার স্বামী খুব একটা সচ্ছল না হওয়ায় চিকিৎসার যাবতীয় খরচ দিচ্ছেন বাবা-মা। মুক্তার কোলে এসেছে আরেকটি ছেলেসন্তানও। জয়নাল-জুলেখা কিনেছেন নতুন জমি, বাড়িয়েছেন চাষের পরিধি।
জুলেখা বলেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী মানুষকে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করে খাওয়াই বলেই হয়তো আল্লাহ মেয়েটাকে ক্যান্সারমুক্ত করেছেন। মেয়েটা এখন পুরোপুরি সুস্থ। তিন মাস পরপর চেকআপ করাতে হয়।’
জয়নাল আবেদীন হাওলাদার বলেন, ‘এই গ্রামে কোথাও সবজি চাষ হতো না। আমিই প্রথম সবজি চাষ শুরু করি। আমি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বরবটি, করলা, শিম, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুনসহ সব ধরনের সবজি চাষ করি বলে এগুলোর খুব চাহিদা। আমার দেখাদেখি এখন গ্রামের অনেকেই বিষমুক্ত সবজি চাষ শুরু করেছেন।’
জয়নাল আবেদীন আরও বলেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী পাল্লা দিয়ে বিষমুক্ত সবজি চাষ ও উৎপাদন করি। আমাদের লাভ-খরচও আলাদা হিসাব থাকে। আমার বিষমুক্ত সবজির বিষয়টি এলাকায় ভাইরাল হয়ে গেছে। তাই কেনার জন্য বাজারে সবাই আমার সবজি খোঁজে। সবজি বেচার টাকায় প্রতিবছর একটু একটু করে নতুন জমি কিনছি। সে জমিতেও চাষ চলছে। প্রতি মৌসুমে আমরা ১০ থেকে ১১ লাখ টাকার সবজি বেচি। খরচ বাদ দিয়ে সাত থেকে আট লাখ টাকা লাভ থাকে। আগে যারা আমাদের ক্ষেতে কাজ করত, এখন তারা নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছে।’
একই গ্রামের আরেক কৃষক জেসমিন আক্তার বলেন, ‘জুলেখা-জয়নাল দম্পতি বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে সোনাতলা গ্রামের মডেল। তাদের সাফল্য দেখে আমিও নিরাপদ সবজির বাগান করেছি। এতে নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি, ক্রেতারাও স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ সবজি খেতে পারছেন।’
বেসরকারি সংস্থা সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (এসডিএফ) ক্লাস্টার কর্মকর্তা চিত্তরঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘জয়নাল-জুলেখা দম্পতিকে বিষমুক্ত সবজি চাষে আমরা প্রশিক্ষণ ও অনুদান দিয়েছি।’
পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, ‘জুলেখা-জয়নাল দম্পতির দেখাদেখি ওই গ্রামের ৫০ থেকে ৭০ জন কিষান-কিষানি সবজি চাষে এগিয়ে এসেছেন।’























