ঢাকা   মঙ্গলবার
১৩ জানুয়ারি ২০২৬
২৯ পৌষ ১৪৩২, ২৪ রজব ১৪৪৭

ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ফল দেখে আশায় বুক বাঁধছেন পাঙাশ চাষিরা

Argi24

প্রকাশিত: ০৮:০৯, ১১ জানুয়ারি ২০২৬

ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ফল দেখে আশায় বুক বাঁধছেন পাঙাশ চাষিরা

বছরে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হয় ময়মনসিংহে। যার অধিকাংশই আসে পাঙাশ মাছ থেকে। পাঙাশ চাষে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাণাঘাতী ব্যাক্টেরিয়া। দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মৎস্য চাষিরা। এই অবস্থায় গবেষণা চালিয়ে সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। পাঙাশের নতুন ভ্যাকসিনের ট্রায়াল চালিয়ে চমকপ্রদ ফল পাওয়া গেছে। চলতি বছরের 

জুন মাস নাগাদ ভ্যাকসিনটি বাজারজাত করার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সিরাজুম মনির জানান, কয়েক বছর ধরে ময়মনসিংহের পাঙাশ চাষিদের প্রধান শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘ব্যাকটেরিয়াল হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া’ নামক ব্যাকটেরিয়া। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন পানির তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে নামে, তখন পাঙাশের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কমে যায়। এই সুযোগে হামলা চালায় ‘আরোনোমাস হাইড্রোফিলা’ নামক শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া।

ত্রিশাল, মুক্তাগাছা ও ফুলবাড়িয়ার পাঙাশ চাষিরা বলছেন, এই রোগে আক্রান্ত মাছের পেটের নিচে রক্তাভ দাগ দেখা দেয়। ভেতর থেকে লিভার বা কলিজা পচে যায়। ভালুকার বেশ কয়েকজন খামারি জানান, আক্রান্ত হওয়ার ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে পুকুরের ৮০ শতাংশ মাছ মরে ভেসে ওঠে।

ড. সিরাজুম মনিরের দীর্ঘ গবেষণায় জানা গেছে, পাঙাশের আরও একটি ঘাতক রোগ হলো ‘ইন্টারিক সেপ্টিসেমিয়া অব ক্যাটফিশ-ইএসসি’। এর জীবাণু হচ্ছে অ্যাডওয়ার্ডসিলা ইক্টালুরি। এটি মাছের মাথায় ছোট ছিদ্র করে ফেলে, যাকে স্থানীয়রা ‘মাথা পচা’ রোগ বলেন। মৎস্য চিকিৎসকদের মতে, পুকুরের তলদেশে ময়লা জমে অ্যামোনিয়া গ্যাস বেড়ে গেলে এই রোগের প্রকোপ দেখা যায়।

অতিরিক্ত ঘনত্ব ও পরিবেশগত বিপর্যয়
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিক মুনাফার লোভে খামারিরা ‘ওভারস্টকিং’ বা অতিরিক্ত ঘনত্বের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। নিয়ম অনুযায়ী, এক বিঘা জলাশয়ে তিন-চার হাজার পোনা থাকার কথা। সেখানে ছাড়া হচ্ছে ১০-১২ হাজার। পাঙাশ মাছ প্রচুর বর্জ্য ত্যাগ করে। এই বর্জ্য পচে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। যখনই অক্সিজেন তিন পিপিএমের নিচে নামে, তখনই মাছ প্রচণ্ড চাপে পড়ে এবং সুপ্ত থাকা জীবাণুগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।

বিএফআরআইর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘মিঠাপানির মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন’ প্রকল্পের আওতায় তৈরির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে পাঙাশের বিশেষ ভ্যাকসিন। এটি কেবল ল্যাবরেটরিতেই সীমাবদ্ধ নয়, মাঠ পর্যায়েও অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ার দাবি তাদের।

ভ্যাকসিন তৈরির নেপথ্যের গল্প
গবেষকরা মাঠ পর্যায় থেকে আক্রান্ত মাছ সংগ্রহ করেন। এর পর মাছের কিডনি, লিভার, মস্তিষ্ক ও প্লিহা থেকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আলাদা করা হয়। ল্যাবে সেগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে একটি ‘নিষ্ক্রিয়’ ভ্যাকসিন প্রস্তুত করা হয়। এতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক ন্যানোপার্টিকেল প্রযুক্তি।

কীভাবে কাজ করে এই ভ্যাকসিন
ভ্যাকসিনটি মূলত দুই ধাপে প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রথমে ব্রুড (মা) পাঙাশ মাছকে ইনজেকশনের মাধ্যমে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এতে ওই মাছ থেকে যে পোনা উৎপন্ন হয়, তার শরীরে জন্মগতভাবেই দুই মাস পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তাছাড়া সাধারণ খামারিদের সুবিধার্থে মাছের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে এই ‘ওরাল ভ্যাকসিন’ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের ফলাফল
ড. সিরাজুম মনির জানান, ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও ঈশ্বরগঞ্জে পাঁচটি খামারে এই ভ্যাকসিনের ট্রায়াল চালানো হয়েছে। এর ফল ছিল রীতিমতো চমকপ্রদ। সাধারণ পোনার বেঁচে থাকার হার যেখানে ৫৫-৬০ শতাংশ, সেখানে ভ্যাকসিন নেওয়া পোনার ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশের বেশি। বিএফআরআইর পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত মাছের রক্তে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। তাছাড়া পুরো চাষকালীন সময়ে ভ্যাকসিন দেওয়া মাছের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ দেখা যায়নি।

বিএফআরআইর মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, কেবল ওষুধ ছিটিয়ে বা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এই মহামারি দমন সম্ভব নয়। উত্তম মৎস্য চাষ পদ্ধতিতে ফিরতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন হবে প্রধান হাতিয়ার। চলতি বছরের জুন মাস নাগাদ এই ভ্যাকসিন বাজারজাত করা সম্ভব হবে বলে আশা তাদের।

যা বলছেন খামারিরা
ত্রিশালের হ্যাচারি ব্যবসায়ী আব্দুল কাইয়ুমের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে পাঙাশের মড়ক তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে বিএফআরআইর পরামর্শে ব্রুড (মা) মাছগুলোকে ইনজেকশনের মাধ্যমে ভ্যাকসিন দেন। পরে দেখা গেল, এই মা মাছ থেকে উৎপাদিত পোনাগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি। আগে যেখানে পোনা ছাড়ার পর বড় হওয়া পর্যন্ত অর্ধেক মাছই মারা যেত, এখন সেখানে লোকসান নেই বললেই চলে। জেলার অন্য খামারিরাও এখন এই ভ্যাকসিন দেওয়া পোনার খোঁজ করছেন।

ভালুকার পাঙাশ চাষি আশরাফুল আলম জানান, ভালুকায় পাঙাশ চাষ অনেকটা জুয়া খেলার মতো হয়ে গিয়েছিল। খাবার কিনতে গিয়ে পকেটে টাকা থাকে না, তার ওপর যদি মড়ক লাগে, তবে পথে বসা ছাড়া উপায় ছিল না। ট্রায়াল হিসেবে তাঁর পুকুরে ওরাল ভ্যাকসিন (খাবারের সঙ্গে মেশানো) ব্যবহার করেছেন। এবার শীতের শুরুতে যখন আশপাশের পুকুরে ‘মাথা পচা’ আর ‘লাল দাগ’ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, তাঁর পুকুরের মাছ তখনও একদম সুস্থ ছিল। মাছের বেড়েছেও চোখে পড়ার মতো। এই ভ্যাকসিন বাজারে এলে সাধারণ চাষিদের অনেক উপকার হবে।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বাগানবাড়ি মৎস্য হ্যাচারির মালিক কামরুল হাসান বলেন, আমরা আগে বুঝতেই পারতাম না, কেন মাছগুলো হঠাৎ করে মরে ভেসে উঠছে। হাজার হাজার টাকার ওষুধ দিয়েও মড়ক থামানো যেত না। কিন্তু এবার বিএফআরআই থেকে বিনামূল্যে ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে অংশ নিয়ে দেখলাম মাছের বেঁচে থাকার হার ৮০ শতাংশের বেশি। এলাকার অনেক খামারি ঋণের ভারে জমি বিক্রি করে দিচ্ছিলেন, এখন বিএফআরআইর এই সাফল্য আমাদের মনে আশা জাগিয়েছে।’
 

সর্বশেষ