ভরা মৌসুমেও উপকূলজুড়ে চলছে ইলিশের জন্য হাহাকার। এক বছরের ব্যবধানে দাম পৌঁছেছে দ্বিগুণে। এমন পরিস্থিতির জন্য অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ার পেছনে অবৈধ ট্রলিংসহ নিষিদ্ধ জালে মাছের ছোট ছোট পোনা নিধনকে দায়ী করছেন ট্রলার মালিকরা।
সুত্র জানায়, বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ মাস ইলিশের মৌসুম। জুলাই-আগস্ট ভরা মৌসুম হলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না এ বছর। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট মাসে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে (বিএফডিসি) ইলিশ কেনাবেচা হয়েছে ৪১৭ দশমিক ৮৪ টন। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি হয়েছে ২৮২ দশমিক দুই-পাঁচ মেট্রিক টন। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে ইলিশ কেনাবেচা হয়েছে ৩৭৯ দশমিক ১৬ টন। অন্যান্য প্রজাতির মাছ বিক্রি হয়েছে ২৪৬ দশমিক ৯৬ টন। অর্থাৎ চলতি মৌসুমে ইলিশ ৩৮ টন ও মিশ্রিত মাছ ৩৬ টন কম পাওয়া গেছে। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ইলিশের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।
সদর উপজেলার গোলবুনিয়া এলাকার পাইকার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, গত বছর প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা। এ বছর বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্রেতা বেশি, মাছ কম। তাই বেশি দামেই কিনছে, আমরাও বিক্রি করছি।
রোববার সকালে বরগুনা মাছ বাজারে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এক কেজি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা, মাঝারি সাইজের (৮০০ গ্রাম থেকে এক কেজির নিচে) কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ১০০ টাকা, জাটকা বিক্রি হয়েছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি।
পাথরঘটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার মোস্তফা কামাল আলম বলেন, অবৈধ ট্রলিং বোট দিয়ে সমুদ্রে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির পোনা নিধন হচ্ছে। তাই নদী-সাগরে মাছ কমে গেছে। জেলেরা সাগরে গিয়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ পান না।
সদর উপজেলার ট্রলার মালিক মো. রাসেল বলেন, একটি ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে অন্তত তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু দুই লাখ টাকারও মাছ পাওয়া যায় না। এ কারণে জেলেদের ন্যায্য মজুরিও দিতে পারি না। এ অবস্থায় মাছের দাম না বাড়ালে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
পাথরঘাটা বিএফডিসির সহকারী মার্কেটিং অফিসার ও মৎস্য গবেষক বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ভরা মৌসুমেও এ বছর ইলিশের দাম কমেনি। সামনে শারদীয়া দুর্গা উৎসব। তাই দাম কমার সম্ভাবনাও কম।
জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী অবাধে জাটকা শিকার। বাজারে ‘চাপিলা’ নামে যে মাছ বিক্রি হয়, সেটা আসলে ছোট ইলিশ। বরগুনায় লাখ লাখ টন এ মাছ বিক্রি হয়। সরকার এবং মৎস্য বিভাগ জাটকা নিধন প্রতিরোধে কাজ করলেও ‘চাপিলার’ দিকে নজর নেই। চাপিলা বাঁচাতে না পারলে নদীর ইলিশও আর টিকবে না।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা শাহজাহান আলী বলেন, জেলে ও ট্রলার মালিকরা সাগর-নদী থেকে ইলিশ শিকার করে নির্দিষ্ট স্থানে বিক্রি করে না। এ কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তবে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিলে এ সংকট কিছুটা হলেও নিরসন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহসীনের দাবি, তুলনামূলক নদী-সাগরে ইলিশ কমেনি। তবে বাজারে দাম কেন কমছে না, এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। মাছের পোনা নিধনের বিষয়ে তিনি বলেন, বরগুনার ২০টি নদীতে ৩৫৬ কিলোমিটার জায়গা কম জনবল দিয়ে পাহারা দেওয়া সম্ভব না। তার পরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ইলিশ রক্ষায় মৎস্য অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটি, কৃষি বিপণন বিভাগ এবং মৎস্যজীবীসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আলোচনা করা হবে। পরে সুপারিশমালা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।























