ঢাকা   শনিবার
২৯ নভেম্বর ২০২৫
১৪ অগ্রাহায়ণ ১৪৩২, ০৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৭

পেকুয়ার তিন ইউনিয়নে ১৫ কোটি টাকার পান

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৯:৪৭, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

পেকুয়ার তিন ইউনিয়নে ১৫ কোটি টাকার পান

সপ্তাহে দুদিন পানের হাট বসে পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের জারুলবনিয়া ও কাছারীমোড়া স্টেশনে। প্রতি মঙ্গলবার জারুলবনিয়া ও শুক্রবার কাছারীমোড়া স্টেশনে ভোর ৬টায় শুরু হয় বেচাকেনা। অর্ধশত বছর ধরে বসা দুই হাটে নিয়ম করে বেচাকেনা চলে মাত্র চার ঘণ্টা। দুই হাটে সপ্তাহে বিক্রি হয় ৩০ লাখ টাকার পান। সে হিসাবে বছরের ৫২ সপ্তায় বিক্রি হয় ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার পান। এসব পান উৎপাদিত হয় উপজেলার তিন ইউনিয়ন শিলখালী, বারবাকিয়া ও টৈটংয়ে। তিন ইউনিয়নের প্রধান অর্থকরী ফসল হলো পান। তবে তুলনামূলকভাবে শিলখালী ইউনিয়নে বেশি পান চাষ হয়। এই ইউনিয়নের ২৫ হাজার মানুষের ৬০ শতাংশই পান উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিলখালী, বারবাকিয়া ও টৈটংয়ের তিনটি ইউনিয়ন মিলে অন্তত ৫০ একর জমিতে রয়েছে অসংখ্য পানের বরজ। এসব বরজে বছরে প্রায় ৩১২ মেট্রিক টন পান উৎপাদিত হয়। এসব এলাকার মাটি মিষ্টি পান চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। তিন ইউনিয়নের সহস্রাধিক মানুষ পান চাষের সঙ্গে যুক্ত। আরও তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে পান শিল্পে। স্থানীয়রা জানান, উপজেলার শিলখালী, বারবাকিয়া ও টৈটং ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় অন্তত ৫০ বছর ধরে চলছে পানের আবাদ। 

জারুলবনিয়া পানবাজারের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল হাকিম (৪৫) বলেন, ‘পান চাষের সঙ্গে এলাকার ৬০ শতাংশ মানুষ জড়িত। পান এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা এনে দিয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে পেকুয়ার পান দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়বে।’ স্থানীয় যুবক আল সেহেরি (২১) বলেন, ‘একসময় বেকার ছিলাম, পান চাষ করে এখন আমি স্বাবলম্বী। সরকার যদি এই খাতে সুদবিহীন কৃষিঋণ দেয়, তাহলে আমরা লাভবান হবো।’

শিলখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান তাহেরা বেগম বলেন, ‘পান চাষ আমাদের এলাকার জন্য আশীর্বাদ। আগে যারা বেকার হয়ে মাদকাসক্ত ছিল, তারাও এখন পান চাষ করে স্বাবলম্বী। ফলে কমেছে বেকারত্ব, যৌন হয়রানি ও মাদকাসক্তি। সরকারের সুনজর পেলে এ খাত আরও এগিয়ে যাবে।’

স্থানীয় কৃষকদের তথ্য মতে, প্রতি চারটি পানে এক গণ্ডা। এক গণ্ডা পান ১০ টাকায় বিক্রি হয়। আর ২০ গণ্ডা বা ৮০টি পানে এক বিড়া।  এক বিড়া বিক্রি হয় ২০০ টাকায়। দেড় বিড়া বা ক্ষেত্রবিশেষে দুই বিড়া পানে এক কেজি হয়। এক কেজি পান ৩০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতি মেট্রিক টন পান ৪৫-৪৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সে হিসাবে বছরে উৎপাদিত ৩১২ মেট্রিক টন পানের দাম প্রায় ১৪-১৫ কোটি টাকা। স্থানীয় কৃষকরা জানান, পানের দর সময় অনুযায়ী ওঠানামা করে। কখনও প্রতি বিড়া পান ১০০-১৫০ টাকা, কখনও ১৮০-২০০ টাকায়ও বিক্রি হয়। 

মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সরেজমিন দেখা যায়, জারুলবনিয়া স্টেশনের পূর্ব পাশে পানের হাট বসেছে। পাইকাররা সেখান থেকে বেছে বেছে পানের ঝুঁড়ি কিনছেন। উপজেলার উজানটিয়া, রাজাখালী, পেকুয়া সদর, মগনামা, টৈটং, বারবাকিয়া ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে  পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসেছেন পান কিনতে। পান বিক্রেতা মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, ‘প্রতি মঙ্গলবার জারুলবনিয়া ও শুক্রবার কাছারীমোড়া স্টেশনে ভোর ৬টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত পানের হাট বসে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা পান কিনতে আসেন। চট্টগ্রামের আড়তেও পিকআপে করে পান পাঠানো হয়। প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার বরজ থেকে পান তোলা হয়। পরদিন জারুলবনিয়া ও কাছারীমোড়া স্টেশনে  বিক্রির জন্য আনেন চাষিরা।’ কাছারীমোড়া পান ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘পান চাষ ও বিক্রির সঙ্গে এলাকার বেশিরভাগ মানুষ জড়িত। পানই এই এলাকার প্রধান অর্থনীতি। হাটের দিন ভোর ছয়টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত পান বিক্রির উৎসব চলে।’

পেকুয়া সদরের চৌমুহনীতে পানের দোকান করেন আহমদ নূর (৩৯)। তিনিও জারুলবনিয়া ও কাছারীমোড়া স্টেশন থেকে নিয়মিত পান কিনে দোকানে বিক্রি করেন। আহমদ নূর বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে ৫০০ বিড়া পান কিনে আনি। হাটে ঘুরে ঘুরে পান কিনি। এই এলাকার পান মিষ্টি এবং দামেও সস্তা।’ তিনি বলেন, কেউ কেউ মহেশখালী থেকেও পান কিনে নিয়ে আসেন।

পানচাষিরা বলেন, প্রাথমিকভাবে ৪০ শতক (এক কানি) জমিতে একটি পানের বরজ তৈরিতে মাচা নির্মাণ, বীজ বপন, সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা মিলিয়ে খরচ হয় আনুমানিক দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। একটি বরজের স্থায়িত্ব থাকে গড়ে ১৫ বছর। বীজ বপনের এক মাস পর থেকেই সপ্তাহে অন্তত দুইবার পান উত্তোলন করা যায়। 

পান চাষি মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘প্রতি ৪০ শতক জমি থেকে প্রতিবছর ৩-৪ লাখ টাকার পান উৎপান হয়। রোগবালাই বা মড়ক দেখা না গেলে চাষিরা খুবই লাভবান হন। তবে অনেক সময় অতিবর্ষণে বরজের ক্ষতি হয় এবং পানের বরজে মড়ক দেখা দেয়। কৃষি অফিসের সহযোগিতায় চাষিরা মড়ক মোকাবিলা করতে শিখে গেছেন।’ 

শিলখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মেম্বার আহমদ শফি বলেন, ‘প্রতি হাটে বাজারে দূরদূরান্ত থেকে অনেক ক্রেতা-বিক্রেতারা আসেন এবং নিরাপদে ব্যবসা করেন। দিন-দিন ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে। এ কারণে বাজারের পরিধি বাড়ানো ও স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা দরকার।’

শিলখালী ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অপরূপ দে বলেন, ‘একসময় পানচাষ মানেই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশা, কিন্তু এখন এটি সম্ভাবনাময় খাত। বর্তমানে প্রশিক্ষিত কৃষকেরা নিজেরাই রোগ চিহ্নিত ও প্রতিকার করতে পারেন। বরজ ব্যবস্থাপনা উন্নত হওয়ায় ফলন ও আয়, দুটিই বেড়েছে।’

পেকুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইছা বলেন, ‘মিষ্টিপান পেকুয়া উপজেলার সম্ভাবনাময় একটি অর্থকরী ফসল। চাষিদের কল্যাণে যা করার আমরা করব।’ সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ