সিরাজগঞ্জের চলনবিল অঞ্চল। উল্লাপাড়া, তাড়াশ, রায়গঞ্জ, শাহজাদপুরের যেখানে চোখ যায়, দিগন্তজুড়ে সরিষার হলুদের ঢেউ। মাঠে পা রাখলেই বাতাসে ভেসে আসে সরিষা ফুলের ঘ্রাণ। তীব্র শীতে হিমেল হাওয়া বইছে, সেই হাওয়ায় দুলছে হলুদ ফুল। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ ছেয়ে আছে হলুদের গালিচায়। সিরাজগঞ্জের আঁকাবাঁকা প্রতিটি ফসলি মাঠ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক রঙিন ক্যানভাস। এক পাশে চাষিরা মৌ-বাক্সে মধু সংগ্রহ করছেন।
সরিষার ফুলে ভরা এই বাক্সগুলোতে জমছে মধু, যা পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। সিরাজগঞ্জ এখন দেশের একক শীর্ষ সরিষা ও মধু উৎপাদনকারী জেলা। একক উপজেলা হিসেবে সিরাজগঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সরিষা হয় উল্লাপাড়ায়। ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষার চাহিদা বাড়ায় এ বছরও রেকর্ড পরিমাণ আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে আশানুরূপ। তেল ও মধু মিলিয়ে জেলায় এবার এক হাজার ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা কৃষি বিভাগের।
নতুন জাতের জাদু
আমন ও বোরো ধানের দুই মৌসুমের মধ্যবর্তী সময় অল্প। পতিত থাকত অধিকাংশ জমি। বিষয়টি মাথায় রেখেই স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। যার নতুন দিশা বারি সরিষা-২০। জাতটি স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চ ফলনশীল, যা বিদ্যমান জাতের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। পাশাপাশি এ সরিষার জাতটি লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত এই জাতটি দেশের অন্যতম সরিষা উৎপাদনকারী এলাকা সিরাজগঞ্জে সম্প্রসারণে সহায়তা করছে পার্টনার (প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ) প্রকল্প।
সিরাজগঞ্জের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কম সময়ে ভালো ফলন দিতে সক্ষম এবং বারি-১৪ কিংবা আগের অন্য জাতের চেয়ে উন্নত হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে নতুন এই জাতটি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
এ ছাড়া আগে যেখানে আমন চাষের পরে প্রচুর জমি বোরো পর্যন্ত অনাবাদি থাকত, এখন সেগুলোতে বারি-২০ সরিষা চাষাবাদ সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের যমুনার চরপূর্ব মোহনপুর গ্রামে সরিষার নতুন এ জাতের ১০০ বিঘার একটি বিশাল প্রদর্শনী করা হয়েছে। যেখানে আগে অন্য জাতের সরিষা আবাদ হলেও এখন বারি-২০-এ ঝুঁকেছেন কৃষক। পার্টনার প্রকল্পের আওতায় ৩৫ জন কৃষকের জমিতে নতুন এই জাতের সরিষার প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ সদরের যমুনার চরপূর্ব মোহনপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আবদুল আউয়াল বলেন, আগে আমন ধানের পরে জমি খালি থাকত। এবার বারি-২০ সরিষার জাত চাষ করেছি। আশা করছি, বিঘায় ছয় থেকে সাত মণ ফলন পাব।
প্রদর্শনী এলাকায় বারির সরেজমিন গবেষণা বিভাগের সহকারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জের জমিতে প্রাথমিক উৎপাদন হিসেবে কৃষকদের বীজ, সারসহ নানা প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়েছে। ৭৫ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই এ সরিষা তোলা যায়। এখন প্রায় দুই মাসের কাছাকাছি সময় সরিষাগুলো মাঠে রয়েছে। এবার উৎপাদন খুব ভালো। সরিষার পরই এ মাঠে বোরো চাষ হবে। এ জাতটি প্রতি বিঘায় ছয় থেকে সাত মণ ফলন হবে। এতে তেলেরও পরিমাণ বাড়বে, কৃষকরা লাভবান হবেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ বছর সিরাজগঞ্জে ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হচ্ছে। যেটা গত বছর ছিল ৮৭ হাজার হেক্টর। প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে প্রায় এক লাখ ৪৬ হাজার টন সরিষা উৎপাদন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছর সিরাজগঞ্জে সরিষা উৎপাদন হয় এক লাখ ৩০ হাজার ৮৬০ টন। টাঙ্গাইলে ৫৯ হাজার ৫৭৬ টন, নওগাঁয় ৫২ হাজার ৮১২ টন, মানিকগঞ্জে ৪৮ হাজার ৮০৬ টন, বগুড়ায় ৪৪ হাজার ৭৩৯ টন, পাবনায় ৪২ হাজার ২৯৫ টন, রাজশাহীতে ৪০ হাজার ৮০৩ টন, জামালপুরে ২৯ হাজার ৫২১ টন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৪ হাজার ৮৩০ টন ও দিনাজপুরে ২৩ হাজার ৫০৬ টন সরিষা উৎপাদন হয়।
বাংলাদেশে বছরে ২৪ লাখ টন তেলের প্রয়োজন। দেশে উৎপাদিত হয় মাত্র সাড়ে ৩ লাখ টন। বাকি চাহিদা আমদানি করতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। পার্টনার প্রকল্পের মাধ্যমে বীজ, সার ও প্রযুক্তিগত সহায়তা সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছেছে। পার্টনার প্রকল্পের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ বলেন, উন্নত জাতের সরিষা চাষের মাধ্যমে দেশের তেলের চাহিদার বড় অংশ পূরণ সম্ভব। এ কারণেই সারাদেশে ৬৫৭টি প্রদর্শনী হয়েছে, নতুন জাত বারি-২০ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মধু সংগ্রহ: সরিষার সঙ্গে দ্বিগুণ আয়
সিরাজগঞ্জে সরিষা ক্ষেতের পাশেই বসানো হয়েছে মৌ-বক্স। মৌমাছি সরিষা ফুলে উড়ে উড়ে মধু সংগ্রহ করছে। এতে ফুলের পরাগায়নে সহায়তা হচ্ছে। একদিকে সরিষার উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত হিসেবে মিলছে মধু। সমন্বিত এ চাষে লাভবান হচ্ছেন কৃষক।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সীমা বলেন, সরিষা উৎপাদন দিন দিন বাড়ার কারণে এখন মধু উৎপাদনেও দেশের একক সেরা উপজেলা উল্লাপাড়া। এখানে সরিষা ও মধু চাষে শত শত বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। গত বছর এ উপজেলায় ১৮৩ টন মধু উৎপাদন হয়েছে, এবার ১৯৫ টন হবে বলে আশা করছি।
তিনি বলেন, আধুনিক জাত যেমন বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৮ এবং বারি সরিষা-২০ আমরা মাঠে সম্প্রসারণ করছি। যেসব জমি দো-ফসলি ছিল সেগুলোতে তারা অল্প সময়ে আবাদ করে তিন ফসলের আওতায় নিয়ে আসতে পারছে। পাশাপাশি ভৌগোলিক কারণে এ মাটি সরিষা উৎপাদনের জন্য ভালো।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুরে মওলা জানান, চলতি মৌসুমে এক লাখ ৪৬ হাজার টন সরিষা এবং চার লাখ চার হাজার কেজি মধু উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। বাজারমূল্য প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকা। সরিষা ও মধুর এই সমন্বয় শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, এলাকার শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থান তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য বলছে, গত বছর প্রাকৃতিক ও চাষ থেকে মধু সংগ্রহ হয়েছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টন। এর মধ্যে অবশ্য চাষের মধু ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ। বাকিটা প্রাকৃতিক।
উল্লাপাড়ার বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নের আলী গ্রামে মধু সংগ্রহ করছে ‘আশার আলো ফুড প্রডাক্ট’। প্রায় ১৫০ বাক্স মৌমাছি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রতি বাক্সে ২০ থেকে ৫০ হাজার মৌমাছি থাকে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আবদুর রশিদ জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি মধু সংগ্রহ করছেন। সপ্তাহে গড়ে ১০ মণ মধু পাওয়া যায়। যার বাজারমূল্য প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মধু উৎপাদনে কোনো একটি জেলাকে এককভাবে শীর্ষ বলা কঠিন। তবে সিরাজগঞ্জ, নড়াইল, সাতক্ষীরা, পাবনা ও নাটোর এলাকাগুলো সরিষা মৌসুমে মধু উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
মধু ও মৌমাছি গবেষক এবং আলওয়ান এন্টারপ্রাইজের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মুহাম্মদ মঈনুল আনোয়ার বলেন, মধু উৎপাদনে শীর্ষে আছে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সাতক্ষীরা ও দিনাজপুর। এ ছাড়া নাটোর, রাজশাহী, নড়াইল, যশোরেও প্রচুর মধু সংগ্রহ হয়।























