ঢাকা   মঙ্গলবার
১৩ জানুয়ারি ২০২৬
২৯ পৌষ ১৪৩২, ২৪ রজব ১৪৪৭

বীজতলা রক্ষায় কৃষকের লড়াই

তীব্র শীত আর কুয়াশায়, ঝুঁকির মুখে বোরো ধানের বীজতলা

Argi24

প্রকাশিত: ০৯:১৬, ৭ জানুয়ারি ২০২৬

তীব্র শীত আর কুয়াশায়, ঝুঁকির মুখে বোরো ধানের বীজতলা

রোপা আমন ধানের কাটা-মাড়াই শেষ করে উত্তরে  এখন পুরোদমে চলছে বোরো আবাদের প্রস্তুতি।   এরই মধ্যে বীজতলাও তৈরি করা হয়েছে।  তবে কয়েকদিনের ঘন কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো শীতে বীজতলার কচি চারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় রয়েছেন এই অঞ্চলের চাষিরা।

রংপুরে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকছে ফসলের মাঠ। এতে রবি ফসল আলু এবং বোরো ধানের বীজতলা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সোমবার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সরিষা, আলু, গম ও তামাক উত্তোলনের পর একই জমিতে বোরো চাষের জন্য কৃষকরা বীজতলা তৈরি করেছেন। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় অনেক জায়গাতেই চারা হলদে বর্ণ ধারণ করেছে।

কৃষকরা চারা রক্ষায় তারা বিভিন্ন আধুনিক ও স্থানীয় কৌশল অবলম্বন করছেন। শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশা থেকে বাঁচাতে চারা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হচ্ছে। রাতের বেলা বীজতলা পানিতে ডুবিয়ে রাখা হচ্ছে এবং সকালে পানি বের করে দেওয়া হচ্ছে। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে চারার ওপর জমে থাকা শিশির ঝরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। চারা পচা রোধে কৃষি বিভাগের পরামর্শে ছত্রাকনাশক স্প্রে করা হচ্ছে।

কাউনিয়া উপজেলার মীরবাগ এলাকার কৃষক আব্দুল গফুর বলেন, ‘ শীতোত নিজের কষ্ট হয় হউক, ধানের বেছন (চারা) তো বাঁচা নাগবে। বোরোর আবাদ না হইলে তো হামাক না খ্যায়া মরা নাগবে।’ একই চিত্র নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ ও রংপুরের পীরগাছাতেও। 

কিশোরগঞ্জের গাড়াগ্রামের কৃষক আবু নছর জানান, ৬০ কেজি ধানের বীজতলা করেছেন। কুয়াশার কারণে সদ্য গজানো চারাগুলো হলদে বর্ণ ধারণ করেছে। পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখছেন। তিনি বলেন,  বীজতলা নষ্ট হলে নতুন করে চারা তৈরির সময় আর থাকবে না, আবার চারা কিনে আবাদ করাও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।

পীরগাছা উপজেলার তালুক উপাসু গ্রামের সহিদুল ইসলাম এক একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করবেন।  এর জন্য চার কেজি ধানের বীজতলা তৈরি করেছেন। চারার বয়স ১৫ দিন পার হয়েছে। ঘন কুয়াশায় ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় পাঁচ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ করা হবে। বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩ হাজার ১৭৫ হেক্টর। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন,  রোদ উঠলে এই সমস্যা কেটে যাবে এবং চারার সজীবতা ফিরে আসবে। বড় কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই যদি কৃষকরা আমাদের পরামর্শ মেনে চলেন।’

বগুড়া জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ জন্য ১০ হাজার ৩৭১ হেক্টরে বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। কয়েক দিনের কুয়াশা ও কনকনে শীতের কারণে প্রায় দেড় হাোর হেক্টর জমির বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটফুলবাড়ি ইউনিয়নের কাঁঠালতলা এলাকার কৃষক মফিজুল ইসলাম বলেন, তাঁর আধা বিঘা জমির বীজতলা কুঁকড়ে গেছে। পলিথিন দিয়ে কুয়াশা থেকে বীজতলা রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, বীজতলা রক্ষায় কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ২-৩ দিনের মধ্যে রোদ উঠলে এ সমস্যা থাকবে না।
শিবগঞ্জ কৃষি বিভাগ জানায়, সেখানে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে ৩০০ হেক্টর জমির। এই বীজতলা দিয়ে অন্ততপক্ষে সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরে বোরো ধান লাগানো যেত।

শিবগঞ্জের রায়নগর এলাকার কৃষক বাদশা মিয়া বলেন, তিন বিঘা জমিতে বীজতলা তৈরি করেছি, যেগুলো নষ্ট হওয়া উপক্রম। বীজতলা রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ক্ষতির পরিমাণ তেমন বেশি না। তবে কিছু এলাকায় নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে। শিগগিরই রোদ না উঠলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম বলেন, শুধু জেলায় ১০ হাজার ৩৭১ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তৈরি হয়েছে ৬ হাজার ৭০০ হেক্টরে। এর মধ্যে দেড় হাজার হেক্টরের বীজতলা ক্ষতির সম্মুখীন। 

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে টানা শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে বোরো ধানের বীজতলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। এক সপ্তাহ ধরে সূর্যের দেখা না মেলায় বীজতলার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় সবুজ চারাগাছ হলুদ ও বিবর্ণ হয়ে পড়ছে। 

বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বীজতলাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সূর্যের আলো না পাওয়ায় চারাগাছ দুর্বল হয়ে পড়ছে, পাতায় হলদে ভাব দেখা দিচ্ছে। কোথাও কোথাও চারাগাছ পচে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এতে কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে দিন দিন।

বীজতলা রক্ষায় কৃষকরা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখছেন, কেউ কেউ ছত্রাকনাশক স্প্রে করছেন। তবুও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে জানান তারা। 

থানাহাট ইউনিয়নের গবেরতল এলাকার কৃষক আকরাম হোসেন ১২ শতক জমিতে ব্রি ধান-১০০ জাতের বীজতলা তৈরি করেছেন। কয়েক দিনের টানা কুয়াশা ও প্রচণ্ড শীতে সেগুলো হলুদ হয়ে গেছে। সময়মতো চারা না পেলে বোরো আবাদ ব্যাহত হবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

রাজারভিটা এলাকার কৃষক আ. কাদের বলেন, ‘বোরো চাষের জন্য বীজতলা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতের কারণে চারাগুলো বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পলিথিন দিয়ে ঢাকার পরও আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, ‘চলতি মৌসুমে ৫১০ হেক্টর জমিতে বোরোর বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কিছু বীজতলায় সাময়িক ক্ষতি হতে পারে। তবে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কম। 

সর্বশেষ