বোরো মৌসুম সামনে রেখে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সদর বাজার ও বাদাঘাট বাজারে বীজ ধান কেনায় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক চাহিদা দেখা গেছে। সরকারের অনুমোদিত ডিলারদের দোকানে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। পছন্দের বীজ কেনার জন্য দরদাম করছেন কৃষকরা, আর প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কারণে ডিলাররা স্বল্প লাভে বীজ ধান বিক্রি করছেন। বাজারগুলোতে সরকারি-বেসরকারি বীজ ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯সহ সরকারি বীজের পাশাপাশি শক্তি-২, শক্তি-৩, ব্র্যাক-৭৭৭, ব্র্যাক-৪৪৪সহ বিভিন্ন কোম্পানির হাইব্রিড বীজে বাজার সয়লাব। বিগত বছরে বাম্পার ফলনের কারণে কৃষকরা এ বছর বেশি পরিমাণে হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকছেন বলে জানান বাজারের বীজ ব্যবসায়ীরা।
ব্র্যাকের পরিচিত জাতের ধান বীজের মধ্যে রয়েছে ব্র্যাক ১৭; যা একটি হাইব্রিড। উচ্চ ফলনের জন্য এর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। ব্র্যাক ১৮ ধান বীজ আমন মৌসুমের জন্য অত্যন্ত উপযোগী একটি উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাত। এ ছাড়া ব্র্যাক ধান ১, শক্তি-২, শক্তি-৩, ব্র্যাক ৭৭৭ এবং ব্র্যাক ৮৮৮-এর মতো উন্নতমানের ধান বীজ বোরো চাষিদের আস্থায় পরিণত হয়েছে; যার প্রতিটি বাংলাদেশের হাওর অধ্যুষিত এলাকার প্রতিবেশ ও জলবায়ু গভীরভাবে নিরীক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
ব্র্যাকের এসব ধান বীজ কেনা যায় ডিলার এবং অনলাইনে। কৃষকরা সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও ব্র্যাকের বিভিন্ন ধানের বীজ সম্পর্কে তথ্য পেয়ে থাকেন। ব্র্যাকের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা জানান, সম্প্রতি ব্র্যাক ধান বীজের সাফল্য অন্যায়ভাবে কাজে লাগাতে এই নাম দিয়ে নকল ধান বীজ বাজারে ছাড়ছে অশুভ চক্র। তারা ন্যূনতম সন্দেহ না রেখে অনলাইনে যাচাই করে বীজ কেনার পরামর্শ দিয়েছেন। বাজারে কিছু প্রতারণামূলক ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে কৃষকরা ব্র্যাকের উচ্চ ফলনশীল ধান বীজ কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাই কেনার সময় সতর্ক থাকা উচিত।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলাতে প্রতি বছর ১৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ হয়। প্রতি বছর বর্ষাকালে মেঘালয় পাহাড় থেকে পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ পলি এসে তাহিরপুর উপজেলার কৃষিজমিতে পড়ে থাকে। যে কারণে এখানকার চাষাবাদের জমিগুলোতে তেমন একটা রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয় না।
শনির হাওরসংলগ্ন ভাটি-তাহিরপুর গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন বলেন, ‘দুই বছর ধরে শক্তি-২ ধানের চাষাবাদ করছি। ফলন ভালো, চাল ঝরঝরে থাকে। তাই এবারও ১০ কেজি কিনলাম।’ একই গ্রামের কৃষক আহমুদুল হাসান বলেন, ‘শনির হাওরে নিচু জমিতে ব্র্যাক ৭৭৭ চাষাবাদ করি। আগাম জাতের বীজ ধান হওয়ায় চৈত্রের মধ্যেই ঘরে তোলা যায়। বন্যার ভয় থাকে না।’ এলাকার কৃষকরা জানান, শক্তি-২, শক্তি-৩ ও ব্র্যাক-৭৭৭ খরা সহনশীল ও উচ্চফলনশীল হওয়ায় এ জাতগুলোর চাহিদা অনেক বেশি।
তিনি আরও জানান, ব্র্যাকের শক্তি-২ হচ্ছে চিকন ধান। এ চালের ভাত খেতে খুবই সুস্বাদু। তাই কৃষকরা তাদের খাওয়ার জন্য শক্তি ধান চাষাবাদ করেন। তাহিরপুর বাজারের বিএডিসি বীজ ডিলার সামায়ন কবির বলেন, বাজারে ব্র্যাক সিডের চাহিদা বেশি ও ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতার কারণে অল্প লাভে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাদাঘাট বাজারের ব্র্যাক সিড ডিলার মো. মোশাররফ হোসেন জানান, ব্র্যাক সিডের হাইব্রিড ধান বীজের চাহিদা ব্যাপক। মৌসুমে এ পর্যন্ত তিনি প্রায় চার হাজার ৪২ জন কৃষকের চাহিদামতো বীজ ধান সরবরাহ করে ন্যায্য দামে বিক্রি করেছেন বলে জানান।
ব্র্যাক সিডের রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার আনিছুর রহমান বলেন, কৃষকরা এবার হাইব্রিড ধান বেশি চাষ করবেন। ব্র্যাক-৭৭৭ আগাম জাতের বীজ হওয়ার পাশাপাশি শক্তি-৩ হাওরে শতকে এক মণ পর্যন্ত ফলন হয়।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, এ বছর বাজারে বীজের সরবরাহ বেশি থাকায় কৃষকরা কম দামে কিনতে পারছেন। কেউ অনুমোদনহীন বা অতিমূল্যে বীজ বিক্রি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজারগুলোতে আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে তদারকি করছেন। তিনি আরও জানান, হাওর থেকে পানি নেমে যাওয়ায় কৃষকরা বীজতলা তৈরি ও জমি প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গত বছরের ভালো ফলন এ বছর তাদের আরও উৎসাহ জুগিয়েছে।























